[প্রথমেই একটা অ্যাকশন: ঢিচক্যাও]
জগদ্ধাত্রী পুজোর ভাসান। এলাকার সবচেয়ে বড় পুজো রামবাবুর। ভাসানে অনেক লোকজন। সকলেই সিদ্ধি খেয়ে মদ খেয়ে উদ্দাম নৃত্যে মশগুল। মধ্যমনি রামবাবু। হটাৎই কোমরের কাছে একটা ঠান্ডা জিনিস ঠেকলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা গুলি। হৈচৈ। ভিড় ছত্রখান। আবার একটা গুলি। লুটিয়ে পড়লেন রামবাবু।
[এরপর নায়িকা কে ইন্ট্রোডিউস করে দেওয়া যাক]
মোবাইলটা ভাইব্রেশনে ছিল, মায়ের অনেকগুলো মিসড কল এসেছে দেখলো রিমা। কাজ থাকলে সে ফোন সাইলেন্ট রাখে, মাও জানে। তাহলে এতো মিস কল করার কি হলো ! কলব্যাক করে সে। ওপ্রান্তে মা ফোন ধরি প্রশ্ন করে ‘হ্যাঁ রে, তুই কতদূর?’
কোনো কি হয়েছে? বিরক্ত হয় রিমা।
ভাটপাড়ায় একটা খুন হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারি। কাকিনারা স্টেশনে অবরোধ চলছে, তুই ফিরবি কিভাবে ?
তাই? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমা। দেখি, আগে শিয়ালদাহ তো যাই তারপর দেখছি। জানাবো।
সাবধানে আসিস। তেমন হলে বেলঘড়িয়ায় ছোটোমাসির বাড়ি…
‘কোথাও যাবো না মা’, কথা শেষ হতে দেয়না রিমা।‘ বাড়িই যাবো। দেখি কিভাবে যাওয়া যায়। রাখছি।‘
[তারপর নায়ক কে]
বিধায়ক শুদ্ধাশীল নন্দীর গোপন দরবার। প্রায় অন্ধকার ঘর। চার পাঁচজন ব্যক্তিগত সহচর। সামনে তপন। শুদ্ধাশীল একটা ২০০ টাকার বান্ডিল ছুড়ে দেয় তপনের দিকে।
মাত্র কুড়ি স্যার? আরেকটু বাড়ান। কাজটায় খুব রিস্ক।
রিস্ক আবার কি ? আমি যতক্ষণ আছি কোনো রিস্ক নেই। পুলিশ কি তোর খবর রাখেনা ভেবেছিস? সব খবর আছে। কিন্তু যতক্ষণ এই হাত তোর মাথায় আছে, তোর কিচ্ছু রিস্ক নেই। যা, এবার যা। অনেক রাত হয়েছে, বাড়ি যা।
[এবার দুজনের দেখা হোক]
ট্রেন বন্ধ হলে শহরতলীর মানুষদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। কিছুটা ট্রেন, তারপর বাস অটো এইসব করে শেষ অব্দি যতটা পৌঁছনো গেলো তাতে বাড়ি আরো আড়াই কিলোমিটার। রাত প্রায় সাড়ে দশটা, গোলমালের দৌলতে রিকশা নেই একটাও।অন্ধকার, নির্জন রাস্তায় একা হেটে আসছিলো, রিমা। পেছন থেকে একটা মোটরসাইকেলের হেডলাইট। রিমা একটু পাশ দেয়। সেটা একটু এগিয়ে এসে থেমে যায়। রিমাও কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়। মোটরসাইকেলে তপন।
কোথায় যাবেন ?
রিমা ইতস্তত করে, কেন বলুন তো ?
এতো রাতে একা? জানেননা ১৪৪ ধারা চলছে? সামনের মোড়েই পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।
কাজ থেকে ফিরছি, ট্রেন চলছে না, রাত তো হয়েই যাবে। পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে আমি কথা বলে নেবো।
আপনি আমায় বিশ্বাস করতে পারেন। কোথায় যাবেন? পাড়ার ভেতর দিয়ে পৌঁছে দিতে পারি।
দরকার নেই। আমি একা চলে যাবো।
অযথা কেন হয়রান হবেন? আপনি আমায় ভরসা করতে পারেন।
দরকার নেই বলেছি তো।
ঠিক সেসময় উল্টোদিক থেকে একটা পুলিশের ভ্যান এসে থামে।
কি হচ্ছে এখানে?
তপন বলে, স্যার বাড়ি ফিরছি। আমার মাসির মেয়ে, অফিস থেকে আসতে রাত করে ফেলেছে। ট্রেন বন্ধ ছিল জানেনই তো। গাড়ি কিছু চলছে না। তাই বাইক করে নিতে এসেছি।
ও তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। বাজে গল্প দেবার জায়গা পায়নি ?
না স্যার, ওর ব্যাগটা পরে গেছিলো, তাই আবার কুড়িয়ে নিয়ে এলো। চম্পা উঠা আয়।
কি নাম আপনার?
রিমা চ্যাটার্জী
ও যে বললো চম্পা।
ডাকনাম।
কোথায় চাকরি করেন?
কলকাতায়। একটা বিউটি পার্লারে।
কি নাম ?
সোনালি’স। সাদার্ন এভিনিউ তে।
এখানে কোথায় থাকেন?
ভটচাজ পাড়া।
হুম। আপনার নাম কি?
তপন সাহা।
কি করেন?
চাকরি করি স্যার, কলকাতায়, একটা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি তে। সিকিউরিটি গার্ড।
আইকার্ড আছে?
হ্যা স্যার, এইযে।
পুলিশ কার্ড দেখে।
আপনিও কি ভটচাজ পাড়া ?
না স্যার, উল্টো দিক। আমায় অনেকটা যেতে হবে। নামিয়ে দিয়ে যাবো।
হুম। তাড়াতাড়ি চলে যান।
রিমা তপনের পেছনে বসে। ওরা রওনা দেয়। পাড়ার ভেতর দিয়ে তপন রিমাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
পুলিশের হয়রানি থেকে কার বেশি বাঁচার দরকার ছিল বলুন তো, আমার না আপনার ?
তাতে কি যায় আসে? কিছুটা পথ হলেও আপনাকে কম হাটতে হলো তো? কিছুটা সময় হলেও আপনি আগে বাড়িতে পোঁছলেন। যদি একটুও উপকার করতে পেরে থাকি, আমাকে মনে রাখবেন।
তপন বাইক চালিয়ে চলে যায়।
[সুযোগমতো নায়িকার একটা হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে দিতে হয়]
কালকের লোকটা কে ছিল রে দিদি ?
বললাম তো একবার, জানি না। রাস্তায় আলাপ।
মা বললেন, এসব অচেনা লোকের সাথে হুট্ করে চলে আসিস, যা দিনকাল, চারদিকে বিপদ আপদ।
জানি মা, সাবধানেই থাকতে চেষ্টা করি। তাই বলে কাউকে বিশ্বাস করবোনা সেতো আর হয় না। এনাকে তো ভদ্রলোক বলেই মনে হলো।
রিমার মোবাইলে একটা মেসেজ আসে : মিস্টার দাস আজ ৭.৩০ এ বুক করেছেন। তোমার বুকিং।
বাস্টার্ড একটা। রিমা মনে মনে বলে। অনেকবার সে ভেবেছে দাসকে আর এটেন্ড করবেনা। কিন্তু লোকটা প্রচুর টাকা দেয়।
দিদি, তোর এই পিঙ্ক লিপস্টিকটা একটু নিলাম।
রিয়া আয়নার সামনে লিপস্টিক খুলে ঠোঁটের কাছে ধরে আছে। খোলা লিপস্টিক রিমার পুরুষাঙ্গের মতো মনে হয়। আর তখনি মনে পরে সন্ধ্যে বেলা আবার মিস্টার দাস, আবার ব্লোজব।
[এবার গল্প জমাতে গেলে ওদের আবার দেখা হওয়া দরকার]
এর কয়েকদিন পর, প্রতিদিনের মতোই রাতে বাড়ি ফেরা সময় শিয়ালদাহ পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেলো রিমার। ট্রেনটা ছেড়ে দিচ্ছিলো, তাই আর লেডিস কামরায় পৌঁছানো হলোনা। শেষ কামরাতে উঠতে হলো। শেষ কামরায় সব সময়ই খুব ভিড় হয়। তার ওপরে গরমকাল, ছেলেদের গায়ের ঘামের গন্ধ, ভিড়, এসব ঠেলে একটু সামনে এগোতেই ডাক পেলো সে, ‘রিমা এদিকে আসুন।’ তাকিয়ে দেখে, তপন। তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছে।
না না, বসুন বসুন। আমি বসবো না।
দাঁড়াতে পারবেন না। বিধাননগর থেকে আরো ভিড় হবে। বসুন।
একপ্রকার জোর করেই হাত ধরে বসিয়ে দেয় রিমাকে। ‘সবকিছুতে এতো হেসিটেট করেন কেন? বলেছি, যদি বিন্দুমাত্র ও কোনো উপকার পেয়ে থাকেন কারো থেকে, মনে রাখবেন। ব্যাস।’
রিমা হেসে বলে, ‘সেদিন আপনাকে ধন্যবাদটাও দেওয়া হয়নি, তার আগেই চলে গেলেন।’
সেদিন আপনি ধন্যবাদ দেবার মুডে ছিলেন না।
রিমা আবার হাসে, ‘না না দিতাম। একটু সময় নিচ্ছিলাম।’
ঐজন্যই আজ দেখা হয়ে গেলো। আপনি কি রোজ এই ট্রেনে ফেরেন ?
ঠিক থাকেনা, তবে মোটামুটি এটাই। আমি লেডিস এ উঠি।
আমি চার নম্বর কামরায় উঠি। আজ একজনের আসার কথা ছিল। তাই এতে উঠলাম, কিন্তু সে ব্যাটা পায়নি ট্রেনটা। যাইহোক আপনার সাথে দেখা হয়ে গেলো।
এরপর টুকটাক গল্পগুজব চলতে থাকে। বেলঘড়িয়ায় ট্রেন একটু ফাঁকা হলে তপন রিমার পাশে বসে। দুপ্যাকেট বাদাম কেনে। রিমা প্রথমে খেতে না চাইলেও, আপত্তি টেকে না।
আচ্ছা, আমার মাসির বাড়িটা ঠিক কোথায়? মানে যে মাসির ছেলে আমায় সেদিন বাড়ি পৌঁছে দিলো, তার বাড়িটা কোথায় ?
আপনি যেখানে নামবেন তার আগের স্টেশনে। তারপর গোয়ালপাড়া যেতে হবে। যাবেন নাকি মাসিকে দেখতে?
সে বাড়িতে কে কে থাকে?
আপনার মাসির বাড়িতে আমি, আর আমার বাড়িতে আপনার মাসি। থুরথুরে বুড়ি তার ঝুরঝুরে বাড়ি। আপনাকে আপ্যায়ন করার কেউ নেই কিন্তু। তবে স্টেশনে আমার মোটরসাইকেল রাখা আছে, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।
আজ থাকে, অন্যকোনোদিন দেখে আসবো মাসিকে।
চাইলে আমার ফোন নম্বর রাখতে পারেন। যেদিন যাবেন ফোন করে দেবেন একটা।
দরকার নেই। আমার ধারণা আপনার সাথে আবার দেখা হবে।
তপনের স্টেশন চলে এলে সে উঠে দাঁড়ায়, আমি ৪ নম্বর কামরার ৩ নম্বর গেট এ থাকি। যেদিন ইচ্ছে হবে চলে আসবেন।
[এবং প্রেম… ]
গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য শরীর বেচতে বেচতে পুরুষের ওপর একপ্রকার ঘেন্নাই ধরে গেছে রিমার। বাড়ি ফিরে শরীরের ময়লা তোলার জন্য শাওয়ারের নিচে যখন দাঁড়ায়, স্তন নাভিমূলে প্রতিদিন নতুন নতুন তৈরী হওয়া আঁচড় কামড়ের ক্ষতগুলোয় জল পড়লে আবার করে চিড়বিড় করে ওঠে, ঘেন্নাগুলো প্রকট হয়। মানুষের কি বিচিত্র যৌন অভীপ্সা। কিন্তু তপন লোকটাকে ভালোই লাগে রিমার, যদিও প্রেমে পড়ার চিন্তাকে একেবারেই প্রশ্রয় দেয়না সে। ট্রেনে ফেরার সময় একবার মনে হয় ৪ নম্বর কামরায় যাওয়া যাক, তবুও লেডিসেই ওঠে সে। তাছাড়া সে ভেবেছিলো, দিন দুই বাদেই তপন ঠিক লেডিসের সামনে এসে দাঁড়াবে। সব ছেলেই বেসিক্যালি এক রকম। কিন্তু কয়েকদিন কেটে গেলেও তপন আসেনা। বাড়ি ফেরার সময় যতই সে তপনকে এক্সপেক্ট করে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যত সে নিজের শরীরের দাগগুলো প্রত্যক্ষ করে, তত সে তপনের প্রেমে পড়তে থাকে।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা তিনজন কাস্টমারকে সামলে ভীষণই ক্লান্ত ছিল রিমা। তারমধ্যে একজন অতন্ত্য নোংরা। শরীরটাকে কোনোমতে টানতে টানতে শিয়ালদাহ স্টেশনে নিয়ে এসে ট্রেনে ওঠার আগে থমকালো সে। লেডিস কামরায় জানলার ধার ফাঁকা, উঠে চোখটা বুজে ফেলা যায়, কিন্তু কি মনে হলো, পায়ে পায়ে ৪ নম্বর কামরার দিকে এগিয়ে গেলো সে। ৩ নম্বর গেট।
রিমা এদিকে আসুন। জায়গা রেখে দিয়েছি।
মৃদু হেসে রিমা পাশে বসে, ‘কি করে জানলেন আমি আজ আসবো ?’
প্রতিদিন একটা নীলকণ্ঠ পাখি আমার জানলায় এসে বসে। আমি মনে মনে ভাবি, যেদিন সে তার একটা পালক আমায় দেবে সেদিন আপনি আসবেন। আজ সকালে দেখি সে তার একটা পালক খসিয়ে দিয়ে গেছে আমার বিছানার ওপর।
রিমা তাকিয়ে থাকে?
এটা নাটকের ডায়ালগ, আমার নয়।
আপনি নাটক ও করেন?
না। ছোটবেলায় আমার পাশের বাড়িতে একটা দিদি ছিল, শিউলিদি। অসামান্য সুন্দরী, ডিগনিফায়েড। তিনি আমায় স্নেহ করতেন, কিন্তু আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখতাম। তিনি নাটক করতেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এইসব ডায়ালগ বলতেন। তারই কিছু মনে রয়ে গেছে।
আর সেই দিদি?
তার যে বয়ফ্রেন্ড ছিল, বিকাশদা, তাকে আমি হেব্বি হিংসে করতাম। একটা পিস্তল জোগাড় করেছিলাম তাকে খুন করবো বলে। সে শিউলিদিকে বিয়ে করে নিয়ে চলে গেছে।
তারপর?
তারপর আর কি? পিস্তলটা এখনো রেখে দিয়েছি। যদিও বিকাশদা কে এখনো খুন করা হয়নি।
রিমা মৃদু হাসে।
আপনাকে একটু টায়ার্ড দেখাচ্ছে। আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখটা বুজে ফেলুন। স্টেশন এলে আমি ডেকে দেব।
রিমা তপনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
না মানে, এতদিন বাদে আপনার সাথে দেখা হলো, গল্প করতে করতে গেলেই ভালো লাগতো, কিন্তু আপনি যখন ক্লান্ত বোধ করছেন তখন…..
রিমা তপনের কাঁধে মাথা রাখে। ‘গল্প করতেই তো এসেছি তপন। ‘ রিমা তপন একটি হাতের তালু নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়।
#
এরপর আরেকটি প্রেমের গল্প শুরু হয়। রিমা এবং তপন একই ট্রেনের কামরায় ফেরে। একই সাথে নামে। তারপর তপনের বাইকে চেপে বাড়ি ফেরে। একদিন সে তপনের বাড়ি যায়, তার মায়ের সাথে কথা হয়।
[এবার ক্রাইসিস শুরু ]
একদিন শুদ্ধাশীল নন্দী তপনকে ডেকে পাঠায়। আবার একটা সুপারি। কিন্তু এবার ব্যবসার হিস্যা নয়, একেবারে পলিটিকাল মার্ডার। তাই কাজ মিটে গেলেই এলাকা ছাড়া হতে হবে মাস ছয়েকের জন্য। যে এজেন্সী তে সে কাজ করে, ওদেরই ঝাড়খণ্ডের একটা কন্সট্রাকশন সাইটে ছমাস বদলি করে দেবে শুদ্ধাশীল। বাড়িতে মাসে মাসে টাকা পৌঁছে যাবে মায়ের কাছে। খালি কাজটা নিপুন দক্ষতায় করতে হবে। এবার তিনগুন টাকা।
যথাসময়ে রিমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, মায়ের সবকিছু গুছিয়ে রেখে তপন ফেরার হয়।
এর কয়েকদিন পর খুন হলেন দলের জেলা সভাধিপতি প্রণব সেন। প্রচুর তল্লাশি, পুলিশি ধরপাকড় শুরু হলো। জেলার নতুন সভাপতি হলেন শুদ্ধাশীল।
তপনের সাথে ফোনে কথা হয় রিমার। হোয়াটস আপে তপন ছবি পাঠায় তার সাইটের। রিমাও তপনের মায়ের খবর রাখে নিয়মিত, তপনকে জানায়।
একদিন একবেলার জন্য তপন কলকাতায় আসে, সেদিন ওরা দেখা করে। তপন রিমাকে বলে ঝাড়খণ্ডে যেতে। তারপর বেশ কয়েকবার ফোনে অনুরোধ করলে, রিমা রাজি হয়। তপনের থাকার জায়গাটা এমনিতে খুব সুন্দর, কিন্তু যেহেতু সব লেবার, এবং কারোরই স্ত্রী থাকেনা, তাই, তপন কোম্পানির গেস্টহাউসে রিমার থাকার ব্যবস্থা করে।
প্রথম রাত্রি যেন মধুচন্দ্রিমার অভিজ্ঞতা। কিন্তু হটাৎই খবর হয় মালিক আসছেন দুদিনের জন্য সাইট পরিদর্শনে। তপন পরে মহা মুশকিলে। না তো কাছাকাছি কোনো হোটেল আছে যেখানে তারা থাকতে পারে, ওদিকে ছুটিও নেওয়া যাবে না এই দুদিন। ম্যানেজার র সাথে কথা বলে ঠিক হয়, সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে ওরা শিফট করে যাবে। যথা সময় মালিক আসেন। তপন রিমাকে আলাপ করিয়ে দেয় নিজের স্ত্রী হিসাবে। কিন্তু কোম্পানির মালিককে দেখে রিমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মি: দাশ।
– তাই নাকি? তপন তুমি বিবাহিত, জানতাম না তো?
তপন বলে, না স্যার, আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু হয়নি, নিজেরাই….
– রিমা, অবিকল আপনার মতন দেখতে একজনকে আমি চিনি, কলকাতায়। সে অবশ্য ..
কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে রিমা বলে ওঠে, ‘তা হবে, কতজনই তো আছে একরকম দেখতে। আমাকে আপনি বলবেন না স্যার, তুমি বলবেন। এখন আসি।’
সেদিন দুপুরেই আদেশ হয় তপনকে শহরে যেতে হবে একটা বিশেষ কাজ নিয়ে। রিমা জানে, এটা দাশের চালাকি। সে কিছুতেই একা থাকতে রাজি হয়না। রাতের ট্রেনেই সে কলকাতা ফেরে।
দুদিন পরেই মিঃ দাশ কলকাতায় ফিরলে, খুব স্বাভাবিক নিয়মেই, রিমার তলব হয়। দাশকে রিফিউস করার আর উপায় নেই তার। তাহলেই তপনকে সে জানিয়ে দেবে কি চাকরি করে রিমা। রিমা জানে সেদিনের ভেস্তে যাওয়া প্লানের শোধ সে তুলে নেবে। রিমা জানে আরো বেশি ক্রীতদাসী হতে হবে তাকে।
তপনকে রিমা বহুবার বলে চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে। কিন্তু তপন জানে শুদ্ধাশীল নন্দীর অনুমতি ছাড়া কলকাতায় ফেরা সম্ভব নয়।
[ক্রাইসিস….প্রেম…ক্রাইসিস…]
প্রণব সেনের মৃত্যু ধামাচাপা পড়লে, তপন ফিরে আসে। প্রথম পর্ব শেষ হয়ে প্রেমের গল্প এবার দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করে। তারা একটা নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখতে থাকে।
#
তপনের আবার ডাক পরে শুদ্ধাশীলের কাছে । এবার একজন মহিলা কে খুন করতে হবে। দেশজুড়ে ছড়ানো তার যৌন ব্যবসার নেটওয়ার্ক। কলকাতাতে বেশ কয়েকটা বিউটি পার্লার, ম্যাসাজ পার্লারের নেপথ্যে তার যৌন ব্যবসা। সব বিগ শট ক্লায়েন্ট। তপন এবার আপত্তি করে, কোনো মহিলা কে খুন করতে সে একেবারেই স্বচ্ছন্দ নয়।
এটা করতেই হবে তপন। সে অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। আমি নিজে ফেঁসে গেছি। আমি ডুবলে তোরা বাঁচবি ?
আমি স্যার কখনো আপনাকে না বলিনি। এটা আপনি অন্য কাউকে দিয়ে দিন।
অন্য কেউ পারলে কি আমি তোকে বলতাম? ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে ওকে মারতে হবে। কিন্তু সিকিউরিটি টপকে ওর ফ্ল্যাটে পৌঁছানো খুব কঠিন। তোর ঢোকার ব্যবস্থা আমি করে দেব, কিন্তু বেরোতে তোকেই হবে। একবার বেরিয়ে এলে তোর প্রটেকশন আমার।
কিন্তু স্যার….
শুদ্ধাশীল নন্দী কখনো না শোনে না। আইদার পারফর্ম অর পেরিশ।
#
মি: দাশের অসভ্যতা প্রতিদিন বাড়ছিল। রিমাকে রুখে দাঁড়াতেই হলো। সপাটে একটা চড়, যদিও ঘরের মধ্যে হলে দাশ হজম করে নিতো, লোকটা শ্যাডোম্যাজিকিস্ট, কিন্তু ঘটনাটা ঘটলো একেবারে পার্লারের ইনচার্জ সুলেখাদির সামনে।ফল যা হবার তাই, রিমাকে ডেকে পাঠালেন মিসেস ঘোষ, পার্লারের মালকিন।
মিসেস ঘোষকে একবারই দেখেছিলো রিমা। তিনি কখনো আসেন না, বাড়ি থেকেই সব কন্ট্রোল করেন। তেমন বিশেষ কারণ ছাড়া তিনি কাউকে ডাকেন না। রিমা ধরেই নিয়েছিল, এই কাজটা তার আর থাকবেনা। কিন্তু তারও কিছু অভিযোগ জানানোর আছে। মিসেস ঘোষ নিশ্চই তার কথাগুলোও শুনবেন।
ঠান্ডা নীল আলোর বাতানুকূল ঘর, মধ্যচল্লিশের সুন্দরী মিসেস ঘোষ। মুখোমুখি রিমা। হালকা ভাবেই তিনি জেনে নিচ্ছিলেন রিমার কথা।
হটাৎ দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে তপন। হাতে পিস্তল। কারো কিছু বোঝার আগেই একটা গুলি ঢুকে যায় মিসেস ঘোষের মাথায়, অন্যটা বুকে।
রিমা চিৎকার করে ওঠে, তপন !
তপন চমকে যায়। রিমা তুমি এখানে কি করছো?
রিমা বাকরুদ্ধ। মিসেস ঘোষের সিকিউরিটিরা কিছু করার আগেই তপন রিমার হাত ধরে হ্যাচকা টানে। বিদ্যুৎ গতিতে মাথায় বুদ্ধি খেলে যায় তার। রিমাকে জাপ্টে ধরে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বেরিয়ে আসা আরো সহজ হয়ে যায়।
[সব গল্পই একসময় শেষ হয়]
কলকাতা থেকে অনেক দূরে, গঙ্গার নির্জন ঘাট। দুজনে মুখোমুখি।
আমি শুদ্ধাশীল নন্দীর ভাড়াটে খুনি।
আর আমি মিসেস ঘোষের কাছে কাজ করা কল গার্ল।
আমি অনেকবার ভেবেছিলাম তোমাকে বলবো। বলা হয়নি।
আমিও।
দুজনেই চুপচাপ বসে থাকে।
তুমি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করো তপন।
তাতে লাভ নেই। জেলের ভেতর শুদ্ধাশীল আমাকে মেরে ফেলবে।
তাহলে? আমাদের কাছে ভালোভাবে বাঁচার আর কোনো অপসন নেই?
আছে। আমাকে আর একটা খুন করতে হবে। চলো তোমায় বাড়ি পৌঁছে দি। কাল সকালে আমি নিজেই থানায় পৌঁছে যাবো।
#
রাত বাড়লে শুদ্ধাশীল কোথায় থাকে জানে তপন। মিসেস ঘোষের খুনের রিপোর্টটা যেহেতু দেওয়া হয়নি তাই, আজ অন্তত শুদ্ধাশীল তাকে সন্দেহ করবে না। পয়েন্ট ব্ল্যান্ক রেঞ্জে একটা গুলি মাথায়, একটা বুকে ঢুকিয়ে দেওয়া তার কাছে জলভাত। রিমা কে নামিয়ে তপন বাইক ঘোরায়।
২০২৪, (শারদীয়া প্রদেশ)
