উৎসবসভায়

বিরাট হলঘরটার এক কোনে সবার অলক্ষে একলা দাঁড়িয়েছিল তিষ্য। তার সামনেই লাইন দিয়ে পাতা গার্ডেন চেয়ার, তাতে রং-বেরঙের পোষাক পড়ে বসে রয়েছেন অনেকে। সকলেই গল্পে মত্ত। তারপর কিছুটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে দুটো পিঁড়ি পাতা। ছাপা কাগজে মোড়া। তার সামনে ফুল, মালা, কুলো, – আরো যত প্রয়োজনীয় উপকরণ। তার সামনে হোমের আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা। তার পরে ঘরের অন্য প্রান্তের দেওয়াল। সবুজ দেওয়ালটার ওপর থার্মোকল কেটে কেটে রং লাগিয়ে সুন্দর করে লেখা রয়েছে, শ্রেয়সী উইডস্ সৌমিত্র।

ঘরের অন্যপ্রান্তে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে সমস্তটা দেখছিল তিষ্য। বিয়ে এখনো শুরু হয়নি, দেরী আছে, বর এখনো আসেনি। তবে আসার সময় নাকি হয়ে গেছে।

শ্রেয়সীর বিয়ে, ভাবছিল তিষ্য, কলেজে তাদের সাত-আটজনের যে গ্রুপটা, একসাথে আড্ডা হতো কলেজের মাঠে, যাওয়া হতো সিনেমায়, গঙ্গার ঘাটে বা অন্যকোথাও সবসময় একসাথে, তার মধ্যে প্রথম বান্ধবীর বিয়ে হচ্ছে, শ্রেয়সীর। বন্ধুরা সবাই নিশ্চই নিমন্ত্রিত, যদিও এখনো দেখা হয়নি কারো সাথেই।

‘সবাই এসেছে, তুই-ই এখন এলি, আমরা তো সেই কাল থেকে আছি,’ বলল অরিন্দম, ওর সাথেই দেখা হলো প্রথম। কাঁধে একটা ক্যামেরা নিয়ে গোটা বাড়ি ওপড় থেকে নীচ করে বেরাচ্ছে। ‘আসলে শ্রেয়সীদের ম্যানপাওয়ার খুব কম, বিপ্লবের ওপর পড়েছে খাওয়াদাওয়া সামলানোর দায়িত্ব। প্রসুন গেছে বর আনতে, অনেক্ষণ গেছে, চলে আসবে। আমি আইবুড়োভাত থেকে ছবি তুলছি।’

আমাদের ব্যাচের মেয়েরা?

হ্যা, স্বাগতা, পিয়ালী সবাই এসেছে। দিয়া তো সাজিয়েছে শ্রেয়সীকে, ও এখন বড় বিউটিশিয়ান। খালি পর্ণা এখানে নেই, ও আসেনি। সবাই তো শ্রেয়সীর কাছেই বসে আছে, যা দেখা করে আয়।

এমন সময় হটাৎ হৈ চৈ পড়ে গেল, বর এসেছে। অরিন্দম ছুটল ক্যামেরা কাঁধে নিচে। শ্রেয়সী কোন ঘরে বসেছে সেটা আর জিগেস করা হ’লনা। এরপর উলুধ্বনি শঙ্খধ্বনি করে নিচে যখন বরণ চলছে, একদল কলহাস্যমুখরা তরুণী তিষ্যর পাশ দিয়ে ছোটাছুটি করে সামনের ঘরটাতে ঢুকে গেল। ওরা নিশ্চই বধূর কাছে বয়ে নিয়ে গেল বরের খবর। তিষ্য বুঝল শ্রেয়সী ওখানেই আছে।

বর আসার খবরে আরো অনেকের মতই বিপ্লবও দায়িত্ব ছেড়ে যাচ্ছিল নিচে। তিষ্যকে দেখেই থমকে পড়ল, ‘ তুই কখন এলি?’

বিপ্লবের মুখে অবাক হওয়ারই ছাপ, তবুও ‘এইমাত্র’ কথাটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিল, ‘চলনা নিচে বর দেখে আসি..’

তিষ্যর কোথাও যেতেই ইচ্ছে করল না, বিশেষকরে নিচে হুড়োহুড়ি চেঁচামেচির মধ্যে।

নাহ্! আমি বরং একবার শ্রেয়সীর সাথে দেখা করি, তুই যা।

বিপ্লব আর দাড়ালো না। তিষ্যও গেল না শ্রেয়সীর সাথে দেখা করতে। সে যেখানে দাড়িয়েছিল সেখানেই দাড়িয়ে রইলো। পাত্রীর কাছে একদল মেয়ের ভিড়, পাত্রর কাছে একদল কৌতুহলী দর্শকের ভিড়, কি দরকার মিছিমিছি উঁকি মারার! বিয়ে যখন এইঘরেই হবে তখন দুজনেই এখানে আসবে,  দুজনকেই দেখা হয়ে যাবে।

বিপ্লব আবার হন্তদন্ত হয়েই ফিরে এলো, ‘বর দেখতেও ব্যাপক হয়েছে।’

কি করে?

ইন্জিনীয়র।

আমাদের বান্ধবীও সুন্দরী।

অফকোর্স! আমি তো বলবো, ওই তিনবছরে আমাদের কলেজের সবথেকে সুন্দরী। দারুন মানাবে।

কথাটায় কোথায় যেন একটু খোঁচা আছে। প্রসঙ্গ বদলালো তিষ্য, ‘তোকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে?’

ওরে বাবা ভীষন ব্যস্ত। খাবার দিকটা পুরো আমি দেখছি। তুই খেয়ে নিবি এখন?

না না , তাড়া কিসের?

বিয়ে তো কিছুটা দেরী আছে, খেয়ে নিতে পারিস, কিছু গল্পও করা যাবে। তুই তো বোধহয় থাকবি না?

তিষ্য এবার মৃদু হাসে।

‘আমরা তো আবার বাসর জাগবো,’ হটাৎ আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিপ্লব, ‘আচ্ছা আমি ভেতরে আছি হ্যা, যখন খাবি আবার দেখা হবে।’

তিষ্য মাথা নাড়ে। বিপ্লব চলে যায়। কলেজের বন্ধুত্বের সেই গভীরতা আজ কোথায়? মাঝখানে শুধু দুটো বছর পার হয়েছে। আর দেখাই হয়না, হটাৎ যদিবা দেখা হলো, বলার মতো বেশী কোনো কথাই নেই যেন। তিষ্য একইজায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো, আর তার চোখের সামনে কলেজ জীবনের একরাশ স্মৃতি ভিড় করে এলো।

একসময় বরকে নিয়ে আসা হলো ওপরে, বিবাহসভায়। কনেকেও। শ্রেয়সী যখন দুচোখ মেলে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালো সৌমিত্রের দিকে, কাছাকাছি কিছু আত্মীয় স্থুল রসিকতায় হৈ হৈ করে উঠল। তিষ্য দেখল, শ্রেয়সীও যেন হাসছে ঈষৎ। মাল্যদান হলো। বারবার জ্বলে উঠল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। শুভদৃষ্টির সেই মিলনমূহুর্তে সকলের পিছনে দাড়িয়ে তিষ্যও তাকিয়ে রইল নবদম্পতির দিকে।

শ্রেয়সী দেখতে পায়নি তিষ্যকে। দেখতে পায়নি অন্য বন্ধুরাও। এত ভিড়ের মধ্যে কেইবা কাকে দেখে। বিয়েবাড়িতে সকলেই বর বা বউকে দেখে, সকলেই নিজের আনন্দে মশগুল।

ভালই হয়েছে শ্রেয়সী দেখেনি। তিষ্যও চেয়েছিল যাতে না দেখে শ্রেয়সী। দেখলে নিশ্চই একবারের জন্য হলেও কেঁপে উঠত সে, মূহুর্তের জন্য আদ্র হতো চোখদুটো, সব সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া দিনের সেই অশ্রুসিক্ত সন্ধ্যেবেলায় মতো।

এটুকুই দেখার ছিল তিষ্যর। এবার ফেরার পালা। ভিড়ের মধ্যে সবার অলক্ষে যেমন সে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি সবার অগোচরে বেড়িয়ে আসে সে। আসে নীচে, রাস্তায়, তারপর রাস্তা টপকে বাসস্যান্ডে। উল্টোদিকেই ‘উৎসব’ অ্যাপার্টমেন্টের দোতলায় বিয়ে হচ্ছে শ্রেয়সীর। একটা হাতের ওপর নিজের হাত রেখে সে আবার স্বপ্ন দেখছে ভালবাসার।

শ্রেয়সীও চায়নি সেই শুভমূহুর্ত বিষাদগ্রস্থ হোক। তাই তিষ্য নিমন্ত্রিত নয় সেই উৎসবসভায়। সে অনাহুত।

১৯৯৭,(সহনাগরিক )

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top