পুকুরের মধ্যে মাছ ধরার জাল পাতা ছিল। পানকৌড়িটা সেটা জানত না। ডুব মেরে আরেকটা মাছ ধরতে গিয়ে আটকে গেল জালে। তারপর শুরু করল খোলার চেষ্টা। আর যত চেষ্টা করতে লাগলো, ততই পেঁচাতে লাগলো জালটা। একসময় ছটফটানি ছাড়া আর কিছুই করার রইল না।
বাবানদের বাড়ীতে বাসন মাজার কাজ করে মালতী। এঁটো বাসনগুলো নিয়ে ঘাটে এসেছিল ধুতে। শ্যামলবাবু ততক্ষণে স্নান করে পুকুর থেকে উঠে পড়েছেন। রোজ এমনটাই হয়, সুপার মার্কেটে শ্যামলবাবুর কাপড়ের দোকান, আড়াইটে নাগাদ বন্ধ করে ফেরেন, তারপর একটু জিরিয়ে গায়ে ভালো করে সরষের তেল মেখে পুকুরে নামেন স্নান করতে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, বেলা বাড়ার সাথে সাথেই সূর্য ম্লান, তার ওপড়ে উত্তরের শিরশিরে হাওয়ায় জাঁকিয়ে শীত পড়ার পূর্বাভাষ, মালতী রোজদিনের মতোই, চেনা মানুষের মুখোমুখি হলে কিছু একটা বলতে হয় তাই, ‘বাপরে কি ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, দাদা আজকেও এতো দেরী হলো!’
‘দেরী কোথায়? শীত গ্রীষ্ম বর্ষা আমার একই রুটিন।’ বলতে বলতে চলে যায় শ্যামল। মালতী সেদিকে না তাকিয়েই বাসন মাজতে মাজতে হটাৎ সামনের দিকে তাকায়। এমাগো! পাখীটা কিভাবে জালে আটকে গেছে! এ মরে যাবে তো!
মালতী বাসন ফেলে উঠে দাড়ায়। পাড় থেকে উঠে বস্তির দিকে যেতে গিয়ে পূর্ণিমাকে দেখে, ‘পূর্ণিমা, দেখতো শ্যামলদাকে দেখতে পাস কিনা, এইমাত্র চান করে গেলেন’ –
নাতো মাসী, কেন গো?
ইস্ দেখনা পাখীটা কিভাবে জালে আটকে গেছে, দাদা এক্ষুনি চান করলেন তখন দেখিনি, ভিজে কাপড়ে ছিলেন, দাদাকে বলতাম একটু খুলে দেবার জন্য।
মালতী ঘাটে নেমে আসে। পেছন পেছন পূর্ণিমা, ‘মাসী দেখ কেমন ছটফট করছে!’
কি করে খুলি বলতো! আর এই শীতকালের বিকেল, জলে নামা যায়? এখনো তিনবাড়ি কাজ বাকী, ভিজে কাপড়ে কিভাবে থাকবো!
পূর্ণিমা হটাৎ পল্টুকে দেখে। ‘মাসী পল্টুদাকে জিগেস করবো চান হয়ে গেছে কিনা?’
মালতী পল্টুকে ডাকে, ‘পল্টু তোর চান হয়ে গেছে রে?’
হ্যা, সে তো কখন! কেন গো?
পাখীটা জালে আটকে কিভাবে ছটফট করছে, কেউ যদি একটু ছাড়িয়ে দিত,-
পল্টু পাড়ে নেমে আসে, ‘ওমা তাইতো! কিন্তু আমি তো সাঁতার জানিনা। আচ্ছা দাড়াও, সাহেবদের একটা বড় লাঠি আছে, ওটা দিয়ে ওরা আম পাড়ে, ওটা নিয়ে আসি।’
গোটা পুকুরটা তো জাল পাতা, আঁকশি দিয়ে এত ভারী জাল টেনে আনতে পারবি?
‘দাড়াও দেখি তো চেষ্টা করে,’ – পল্টু যায় লাঠি আনতে। ওদিকে পানকৌড়ি যত ছটফট করে, তত জালে জড়াতে থাকে।
লাঠি নিয়ে পল্টু আসে, সাথে বিলু এবং পাড়ার আরো দুজন। পল্টুর লাঠি জাল অব্দি গেলেও টেনে আনতে পারে না। উল্টে পাখিটা আরো ভয় পেয়ে ছটফট করতে থাকে। বিলু তৎপর হয়ে ওঠে, ‘সরো পল্টুদা, আমি সাঁতরে গিয়ে খুলে দিচ্ছি।’
বিলু এদের মধ্যে সবথেকে ছোট, পূর্ণিমার মতোই, মালতী তাই মৃদু আপত্তি করে, ‘না বাবা তুই বাচ্চা ছেলে, তুই পারবি না।’
যদিও বিলু ততক্ষণে জামা ছেড়ে হাফপ্যান্ট পড়ে জলে নেমে পড়ে। সে পাখিটার কাছে গিয়ে খোলার চেষ্টা করে কিন্তু প্রথমত পাখিটা জালে বেশ জরিয়ে গেছে, তদুপরি ভয়ে এত ছটফট করে যে বিলুও বারবার ভয়ে হাত সরিয়ে নেয়। মালতী পাড়ে দাড়িয়ে সাবধান করতে থাকে, ‘তুই বাবা পারবি না, তুই উঠে আয়, একই ঠান্ডা লাগাবি, তার ওপরে তুই বাচ্চা ছেলে জালে পা জড়ালে কেলেঙ্কারির একসা।’
বিলু আরো কিছুক্ষণ চেষ্টা করে ফিরে আসে। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিদের মধ্যে একজন বলে, জেলেগুলো তো ওইপাড়ে বসেই তাস খেলছে, ওদের ডাকলেই তো হয়। ওদের নৌকা আছে এসে খুলে দিয়ে যাবে। নয়তো এভাবে এই ঠান্ডায় জলে নেমে খোলা মুষ্কিল, আর চান করাও কারো বাকী নেই।
প্রথমে পল্টু তারপর মালতী এবং বাকিরাও সমস্বরে জেলেদের ডাকতে থাকে, ‘ও দাদা! ও ভাই! একবার এসে পাখিটাকে একটু খুলে দিয়ে যাওনা…’
জেলেরা পাড়ে বসে তাস খেলছিল, প্রথমে ডাকাডাকি শুনে তাকালো, কিন্তু ব্যাপারটা পাত্তা না দিয়ে নিজেদের মতো খেলতে থাকে। ওদিকে পানকৌড়ি নিজেকে ছাড়ানোর নিরন্তর চেষ্টা করতে থাকে এবং ক্রমশঃ নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
মালতী একটু অবাক হয়, ‘কি ব্যাপার বলুন তো! এত জোরে ডাকছি শুনতে পাচ্ছে না নাকি?’
না না সব শুনতে পাচ্ছে, ইচ্ছে করে ঢ্যামনামি করছে।
পল্টু বলে, ‘দাড়াও মাসী, আমি ওদিক দিয়েই যাচ্ছি এক্ষুনি, গিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিচ্ছি।‘
সাহেবদের লম্বা লাঠিটা ফেরত দিয়ে পল্টু ঝিলের ওপাড়ে মাঝিদের কাছে যায়। ওদের মধ্যে বাসু পাড়ারই ছেলে, পল্টু চেনে, ‘অ্যাই বাসু! তোদের এতো করে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না। দেখ ওপাড়ে একটা পানকৌড়ি জালে আটকে গেছে, যাতো একটু ছাড়িয়ে দিয়ে আয়।’
ওতো হামেশাই আটকায়। তোমরা হটাৎ ওটা নিয়ে পড়লে কেন! দেখছ খেলাটা সবেমাত্র জমে উঠেছে।
পরে খেলবি, আগে যা, পাখীটা ছটফট করছে।
পল্টুর ধমকে বাসু তাস ফেলে উঠে দাড়ায়, ওহ্ পল্টুদা, তোমরা না পারো বটে। পাশের একজনকে নিয়ে বাসু নৌকায় ওঠে।
নৌকায় দুজন জেলেকে পাঠিয়ে পল্টু কাজে যায়। নৌকা আসতে দেখে মালতী আর পাড়ের বাকি লোকজন আস্বস্থ হয়।
নৌকায় বসে বাসু প্রথমে খোলার চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু পানকৌড়িও ভয়ে ছটফট করতে থাকে। নৌকার দ্বিতীয় জেলে দাঁড় দিয়ে পানকৌড়ির মাথায় দড়াম করে মারে।
মালতী চেঁচায়, ‘আরে মরে যাবে তো!’
ও এমনি খোলা যাবে না। মরুক। রোজ বেটা আমাদের প্রচুর মাছ খায়, আজ আমরা এটাকে খাবো।
নিস্তেজ পানকৌড়িকে জাল থেকে ছাড়িয়ে বাসু নৌকায় রাখে।
পানকৌড়ির লড়াই শেষ হয়। তাকে বাঁচানোর জন্য মালতীর যাবতীয় উদ্বেগ শেষ হয়। যেহেতু অনেকটা সময় এভাবে খরচ হলো তাই, আরো তিন বাড়ি বাসন মাজা বাকী, মালতী দ্রুত কাজে মনোনিবেশ করে। পুকুরপাড়ের ভিড় আস্তে আস্তে সরে যায়। সূর্য আরো কিছুটা ম্লান হয়। উত্তরের শিরশিরে হাওয়ার গতি বাড়ে। মাথায় অসম্ভব যন্ত্রনা নিয়ে নৌকার পাটাতনে শুয়ে পানকৌড়িটি তার শেষ হৃদস্পন্দন অনুভব করার এবং ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে আসা দৃষ্টি সম্পুর্ণ অন্ধকার হয়ে যাবার আগে দেখে, পাড়ে দাড়িয়ে পূর্ণিমা তার জন্য তখনো কাঁদছে।
২০০০ (সহনাগরিক)
