সুনীপা মারা গেছে।
খবরটা পাবার পর আমরা বন্ধুরা সারাক্ষণই দিবাকরের সাথে থেকেছি। হাসপাতাল থেকে সুনীপার মৃতদেহ নিয়ে আসা, তারপর বুবুন এলো হায়দ্রাবাদ থেকে, তারপর দাহ করা, পুরোটাই। দিবাকরের সাথে সাতাশ বছরের বিবাহিত জীবন সুনীপার, আমাদের সাথেও ততদিনের আলাপ। খুব হাসিখুশি ছিল। প্রায়শই রোববার সকালে ওর হাতে আমাদের চা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। কারণ বেশিরভাগ আড্ডাটা আমাদের দিবাকরের বাড়িতেই বসতো। সুনীপার চেহারাটা একটু ভারী ছিল, কিছুদিন ধরেই বেশি ক্লোরেস্টেরল, সুগার কাবু করেছিল ওকে, ইদানিং হার্টের অসুখ। তাই আড্ডাটাও আমরা নবীনের বাড়িতে শিফট করেছিলাম। তবু দেখা হলেই বলতো, ওসব কিছু না, চলে এসো পরের রোববার, লুচি আর ছোলার ডাল খাওয়াবো, তারপর চা। সেটা বাকি থেকে গেলো, সুনীপা চলে গেলো। আমাদের চার পাঁচজনের এই ঘনিষ্ট বন্ধুবৃত্তের প্রথম পত্নীবিয়োগ।
বেশ ঘটা করে শ্রাদ্ধশান্তি করলো দিবাকর। ওদের একমাত্র ছেলে বুবুন, ভালো নাম যেন কি বেশ, খুব খটোমটো, বি-টেক করে এখন হায়দ্রাবাদে চাকরিতে জয়েন করেছে। নতুন চাকরি তাই, মায়ের শ্রাদ্ধ করেই চলে গেলো। দিবাকর একা হয়ে গেলো। চাকরি এখনো বছর খানেক বাকি। অফিস থেকে ফিরে আমরা রোজই কোথাও না কোথাও বসি, গল্প হয়, বুঝতে পারি, দিবাকর বেশ একা হয়ে গেছে। আমাদের সবারই ছোট খাটো ফ্ল্যাট, কেবল দিবাকরেরই বিরাট জায়গা জমি সমেত বড়ো পৈতৃক বাড়ি, বুঝে পাইনা কিভাবে সামলাবে। কেউ পরামর্শ দেয়, বাড়ি বেচে ফ্ল্যাট করে নে, কিছু টাকাও পাবি, একটা ফ্ল্যাটও থাকবে থাকার জন্য, ছেলে তো এদিকে কবে আসবে ঠিক নেই, নিজের মতো সেটল করে যাবে, তুই এই বয়েসে বেকার ভুতের বাড়ি সামলাবি কেন? কিন্তু দিবাকর চট করে ছাড়তে চায় না ‘বাপ্ ঠাকুরদার স্মৃতি’।
একদিন, ঘরোয়া আড্ডায়, কিঞ্চিৎ মদ্যপান করেছিলাম সবাই, আমি বলে বসলাম, একটা আবার বিয়ে করে নে। শুনতে খারাপ লাগছে হয়তো, সুনীপাকে আমরা সবাই খুব ভালোবাসতাম কিন্ত বাঁচামড়া তো কারো হাতে নেই। যেকোনো মানুষেরই এক থাকাটা ভীষণ কঠিন।
তাতে বাকিরা আমায় উপহাস করলো, আর দিবাকর তো একটু রেগেই গেলো আমার ওপর। সুনীপাকে ভোলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া ছেলে অনেক বড়ো হয়ে গেছে, এই বয়েসে বিয়ে করে লোক হাসানো তার পক্ষে অসম্ভব। সেদিন আড্ডাটা আমার বাড়িতেই হচ্ছিলো, আমার বৌ আমায় মুখ ঝামটা দিয়ে উঠে গেলো, সবাই কি আর তোমার মতো? বৌ মরার অপেক্ষায় দিন গুনচো ? আমি মরলেই আবার বিয়ে করতে ছুটবে।
দিবাকর বিয়ে করলো না। এবং আস্তে আস্তে আমাদের আড্ডায় আসাও কমিয়ে দিলো। এমনকি যে রোববার সকালে প্রিয়তোষের বৌ আমাদের লুচি, আলুর সাদা ঝোল ঝোল তরকারি আর সিমাইয়ের পায়েস করে খাওয়ালো, সেদিনও এলোনা। খেয়েদেয়ে আমরাই সে রোববার সকালে দল বেঁধে দিবাকরের বাড়ি হাজির হলাম।
গিয়ে দেখি দিবাকরও লুচিই সাঁটাচ্ছে।
যে কাজের মহিলা রান্না করতো, সে নাকি এখন দুবেলায় রান্না করে দেয় । তার সাথে বাকি বাড়িও গুছিয়ে দেয় । দিবাকর তার মাইনে বাড়িয়ে দিয়েছে। সেও অন্যান্য বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়েছে। দিবাকরের বাড়িতেই কাজ করছে। রান্না ঝাড়পোছ কাচাকাচি সব সেই সামলাচ্ছে।
আমাদের জলখাবার খাওয়া হয়েই গেছিলো, চা দিবাকরের বাড়িতে খেলাম।
আমি স্পষ্ট কথা স্পষ্ট ভাবে বলতেই ভালোবাসি। বাড়ি এসে বৌকে সেদিনের মুখ ঝামটানির রেফারেন্স টেনে বললাম, আমার প্রস্তাবটা এর থেকে বেটার ছিল।
***
দিবাকরের সেই কাজের মেয়েটির নাম বিমলা। বয়েস মধ্য-ত্রিশ। বর ছেড়ে চলে গেছে বলে লোকের বাড়ি কাজ নিয়েছিল। একটা ছেলে একটা মেয়ে আছে। বিমলা প্রথমে সারাদিন থাকতো, দিবাকর অফিস থেকে ফিরলে, চা করে, খাবার করে, রাতে শোবার বিছানা করে তারপর যেত। একদিন দিবাকর জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরলো, সাথে মাথা যন্ত্রনা। বিমলা রাতের বেলা আর বাড়ি ফিরলো না। দিবাকরের শুশ্রূষা করে, মাথায় জলপট্টি দিয়ে ওষুধ দিয়ে সুস্থ করলো। আমরাও একদিন গিয়ে দেখে এলাম।
এরপর বিমলা ওবাড়িতেই থেকে গেলো। অত বড়ো বাড়ি, সব ঘর এমনিতে বন্ধই থাকে, একটা ঘরে বিমলা থাকলে তার বাড়ি ভাড়াও বেঁচে যায়। তারপর একদিন বিমলা তার ছেলে মেয়েকেও নিয়ে এলো মায়ের কাছ থেকে। তারা এখানে থেকেই স্কুলে যেতে থাকলো। দিবাকর এখন সেসব খরচও করে। আমাদের আড্ডায় কেউ কেউ একে অপচয় মনে করলেও দিবাকর তাতে কর্ণপাত করে না। অত বড়ো বাড়িতে যেখানে স্থানাভাব নেই সেখানে কয়েকজন গরিব মানুষ থাকলে আর দুজনের পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করাকে দিবাকর সামাজিক দায়িত্ব বলেই মনে করে। দিবাকরের অকাট্য যুক্তি, সেটাও দিবাকর ফ্রি করছে না, তাদের সার্ভিস সে নিচ্ছে।
কিন্তু এইসব অপ্রীতিকর আলোচনা যেহেতু বারবার ফিরে আসে, দিবাকর একসময় আমাদের আড্ডায় আসা পুরো বন্ধই করে দিলো। আমরাও ওর বাড়িতে যাওয়া একসময় বন্ধ করে দিলাম। যে লোক হাসানোর ভয়ে দিবাকর সেদিন আমার সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি, সেই লোক হাসাহাসি এবার পাড়ার মধ্যে শুরু হয়ে গেলো। আমরা আর দিবাকরকে জিগেস করিনি, বিমলাকে সে বিয়ে করেছে কিনা? আমাদের স্মৃতিতে ওই বাড়িটার যে ছবি ছিল সেটা অনেকটাই বদলে গেছিলো।
এক এক করে আমরা রিটায়ারও করতে থাকলাম। শুনলাম বিমলার মেয়ের বিয়েও ওই বাড়ি থেকেই হলো। দিবাকর দাঁড়িয়ে থেকে সমস্ত খরচ করলো।
***
এর বেশ কিছুদিন পর একদিন বাজারে হটাৎ দিবাকরের সাথে দেখা। কঙ্কালসার চেহারা, একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি, উস্কো খুস্কো চুল। আমাকে ও এড়িয়েই যাচ্ছিলো, কিন্তু এতদিনের বন্ধু, আমি আর থাকতে না পেরে ডেকে বললাম, একি চেহারা হয়েছে তোর ?
বুঝলাম খুব অশান্তিতে আছে। ছেলে ব্যাঙ্গালোরে, বিয়ে করেছে। রোজ ফোনে দিবাকরের সাথে অশান্তি হচ্ছে সম্পত্তি নিয়ে। মাঝে সে এসেওছিলো কিন্তু বিমলার ছেলে তাকে ঢুকতে দেয়নি। সে নাকি পাড়ার দাদা হয়েছে। বাড়ির একতলাতে সে সিন্ডিকেটের অফিসে খুলেছে।
আমরা গুপির দোকানে দাঁড়িয়ে ভাঁড়ে চা খেলাম অনেকদিন পর। বললাম একদিন বাড়িতে আয়, বাকিদের ডাকি, সবাই মিলে কথা বলি কি করা যায়।
পরেরদিন বন্ধুদের আড্ডায় সেকথা বললামও। যদিও দিবাকর এলোনা। কদিন বাদে জানলাম দিবাকর আর আসবেনা। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে সে চলে গেছে। কখন, কিকরে মরেছে, কেউ জানে না। কখন যে বাড়ির লোক ওকে পুড়িয়ে দিয়ে এসেছে সেটাই কেউ দেখেনি। আমি বৌকে বললাম, অনেকদিন আগেই দিবাকর মরে গেছে। আমার সাথে যেদিন দেখা হয়েছিল, তারও অনেকদিন আগে।
আমরা বন্ধুরাই অনেক খুঁজে বুবুনের নম্বর জোগাড় করে ওকে ফোন করলাম। বুবুন বাবার ওপর ভীষণ চটে ছিল। যা জানলাম, বিমলা বাড়ি এবং সুনীপার সব গয়না নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে। টাকাটাও সব নিতে চেষ্টা করেছিল, সবটা পারেনি। কিছু টাকা দিবাকর বুবুনকে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিলো। তারপরই দিবাকর মারা গেছে।
আমরা বুবুনকে বললাম, তুই একদিন আয়, উকিলের সাথে কথা বল, তোর তো বাড়িতে অধিকার আছে, ছাড়বি কেন ?
বুবুন একদিন ব্যাঙ্গালোর থেকে এলো। আমার বাড়িতেই উঠলো। আমরা বন্ধুরা মিলে বুবুনকে নিয়ে দিবাকরের বাড়িতে গেলাম। বিমলা অবশ্য ভেতরে ঢুকে বসতে বললো, চা করে নিয়ে এলো। তারপর যা জানালো, বিমলাই বাড়ির মালিক, দিবাকর দানপত্র করে দিয়ে গেছে, দলিলও রেজিট্রি হয়ে গেছে। দিবাকরের সই করা দলিল দেখলাম আমরা। বাড়িতে আরেকজন নতুন প্রৌঢ় কে দেখলাম। সে বিমলার সেই ছেড়ে যাওয়া স্বামী। ফিরে এসেছে। এই বাড়িতেই থাকছে। বিমলার ছেলে এসে আমাদের সবাইকেই একবার মেপে গেলো। ভাবখানা অনেকটা এরকম, যদি এই ইসু তে ফের ঐবাড়িমুখো হোই , চাপ আছে।
বুবুন কোনো কেস করবে কিনা কিছু বললো না। সে রাতেই সে ব্যাঙ্গালোরে ফিরে গেলো। আমাদের বন্ধুরাও আর এই বয়েসে উটকো ঝামেলায় জড়াতে চাইলাম না। বাড়িটা একদিন ভাঙা শুরু হলো। অনেকটা জমি আছে, ওখানে, একটা হাই-রাইস হবে। বিমলার ছেলেই প্রোমোটার।
অনেকদিনই ওপাড়া দিয়ে যাবার সময় ভ্যানে করে ভাঙা ইঁট নিয়ে যেতে দেখি। ইঁটগুলোর মতোই স্মৃতি থেকেও দিবাকর সুনীপা বুবুন একটু একটু করে চলে যায়। বয়েস বেড়েছে বলে এমনিতেই খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। তবু কখনো হটাৎ কারো বাড়িতে আড্ডায় ভালো মন্দ খাওয়া হলে সুনীপা দিবাকরকে মনে পরে, সেই সব রোববারের সকাল গুলো মিস করি।
কিছুদিন আগে নবীন চলে গেলো। কে যে কখন আছি, কখন নেই ! আজ প্রিয়তোষ ফোন করেছিল একটু আগে। কাল রাতে ওর বৌ-এর স্ট্রোক হয়েছে। হস্পিটালাইজড।
২০২৪, (শারদীয়া মনকথা)
