ভোঁকাট্টা

ভোঁকাট্টা শব্দটা বললে আমি মূলত কেটে যাওয়া ঘুড়িকেই বুঝি। রূপকার্থে হয়তো এর অনেক প্রয়োগ আছে, ছেড়ে যাওয়া ভালোবাসা, ভেঙে যাওয়া ঘর, হেজে যাওয়া মানুষ… কিন্তু আক্ষরিক অর্থে ভোঁকাট্টা আমার কাছে কেটে যাওয়া ঘুড়ি।

ঘুড়ি ওড়ানো আমার বাবার ছিল না-পসন্দ। ফলে আমার ছোটবেলায় না ছিল নিজের লাটাই – মাঞ্জাসুতো, না ছিল ঘুড়ি। বরাহনগরে ভাড়া বাড়িতে থাকতাম, পাড়ায় মাঠ যেটা ছিল তাতে বড়োরা খেলতো, আমরা ছোটরা পাশের একটা চওড়া জায়গায় খেলতাম। কিন্তু ১৫ই আগস্টের পর থেকেই ১৭ সেপ্টেম্বর (বিশ্বকর্মা পুজো) বা তার পর আরো কিছুদিন আমার বিকেলের খেলার বন্ধুরা ঘুড়ি ওড়াতে মেতে যেতো। ফলে সেসময় বিকেলগুলো আমার কিছু করার থাকতো না। বাবার অমত থাকলেও, মায়ের গোপন প্রশ্রয়ে, বিকেলবেলা বন্ধুদের সাথে ওদের ছাদে উঠতাম। যেহেতু আমার নিজের কিছু ছিলোনা, তাই আমার কাজ ছিল লাটাই ধরা, কেউ প্যাঁচ খেলতে না চাইলে তাকে দুয়ো দেওয়া আর মাঝে মাঝে ঘুড়ি কাটতে পারলে ভোঁকাট্টা বলে চিৎকার করা। ভালো করে ঘুড়ি ওড়াতে আমি কোনোদিন শিখিনি।

তখন ক্লাস সেভেন, আমি এক বালিকার প্রতি গোপন প্রেমে পাগল, তার নাম নিলি। এমনি তাকে দেখতে পাওয়া যায়না, কেবল বিকেলবেলা সে ছাদে ওঠে। তাদের ছাদ সবথেকে বেশি ভালো দেখা যায় আমাদের ভাড়াবাড়ির ছাদ থেকে, ওটাই বেস্ট পসিশন। কিন্তু ছাদে উঠে তো আর হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা যায়না, ঘুড়ি লাটাই চাই। আমি আর রাঙ্কা ঠিক করলাম এবার নিজেরা মাঞ্জা দিয়ে ঘুড়ি ওড়াবো। বাবার পকেট থেকে ৫ টাকা নিয়ে একটা ৫০০ সুতোর রীল কিনলাম। কিন্তু মাঞ্জা কিকরে দিই? সে অনেক হ্যাপা, হামানদিস্তায় টিউবলাইট গুঁড়ো করো, সাবু জাল দাও এসব কিভাবে হবে? আর টাকাই বা কোথায়? সারা বিকেল ধরে রাঙ্কার বাড়িতে এসব চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পরে গেলাম। রাঙ্কার মা আমার মায়ের কাছে সুতো সমেত আমাকে জমা করে গেলেন। মা খুব দুঃখ পেলো, আমাকে শুধু বললো, ‘তুই টাকা চুরি করলি?’ রাতে বাবা বাড়ি এসে সব শুনে ঠাঁটিয়ে গালে এক চর কষালো, তারপর সুতোর রিলটা জানলা দিয়ে বাইরে নর্দমায় ফেলে দিলো। মা খুব চুপচাপ হয়ে গেলো, বুঝলাম, যে টাকাটা চাইলেই মা দিয়ে দিতো,তার জন্য অকারণে চোর হয়ে গেলাম।

 বিশ্বকর্মা পুজোর দিন আমার বাকি সব বন্ধুরা কাসর ঘন্টা ঘুড়ি লাটাই নিয়ে ছাদে উঠেছে, চোর আমি, মাকে বলার মুখ নেই ওদের সাথে যাবো, বেজার মুখে নিজেদের ভাড়াবাড়ির ছাদে উঠে আকাশের দিকে চেয়ে আছি, আর মাঝে মাঝে নিলিদের বাড়ির দিকে। নিলি, নিলির দিদি রিঙ্কুদি, তার সাথে বিয়ে হবে পাড়ারই এক দাদা মনুদা, তারা সবাই ওই ছাদে।

কথায় বলে, যার কেউ নেই তার ভগবান আছে। হটাৎই, একটা ঘুড়ি, দেড়তে চাঁদিয়াল, প্রচুর সুতোসমেত কেটে এসে একেবারে আমার মাথার ওপর। ধরলাম, একটা কাঠের স্কেল নিয়ে এসে তাতে সুতো গোটালাম, তারপর ওড়াতে চেষ্টা শুরু করলাম।  বিশ্বাস করুন, জীবনে প্রথমবার, সামনের ইলেক্ট্রিকের তার এড়িয়ে, পকাইদের নারকেলগাছে না জড়িয়ে, শিবুদাদের এন্টেনায় গোৎ না খেয়ে, আমার সেই ঈশ্বরপ্রদত্ত দেড়তে ঘুড়ি পতপত করে আকাশে উড়ে থাম্বা হয়ে রইলো। জীবনে এই প্রথম সাফল্যে উচ্ছসিত আমি, একবার ঘুড়ি আর একবার নিলিকে দেখতে থাকলাম।

কিন্তু সুখ ক্ষণস্থায়ী। মনুদার ঘুড়ি এসে চড়চড় করে টেনে আমার ঘুড়ি হাতগোড়া থেকে কেটে দিলো। ভোঁকাট্টা। জীবনের চরম কোনো ক্ষতি নয়, বালকমনের সবহারানো এক দুর্মূল্য অনুভূতি। ঘুড়ি কেটে যাবার পর হাতে থাকা অবশিষ্ট সুতোটা কেমন তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে নেমে আসে দেখেছেন কোনোদিন? আমি দেখেছি। আমার কাটা ঘুড়ি ভাসতে ভাসতে নতুন ঠিকানায় চলে গেলো।

পুনশ্চ:

নিলির প্রতি আমার গোপন ভালোবাসা জানাজানি হয়ে গিয়েছিলো। তারপর মনুদা আমায় ডেকে একদিন এমন কড়কে দিয়েছিল যে আমি আর ওই গলিতে খেলতে যাইনি (তখন পাড়ার দাদারা এইসব গুরুজনীয় কাজকর্ম করতেন)। এর কিছুদিন পরে আমার বাবা বেলঘড়িয়ায় বাড়ি করে। আমরা চলে আসি। নিলির বিয়ে হয়েছে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের সাথে, এখন উড়িষ্যায় থাকে। কদিন আগেই ডানলপে দেখলাম ছেলেকে নিয়ে বাজার করতে এসেছিলো। দুবছর হলো মনুদা মারা গেছে, ব্রেন ক্যান্সারে।  রিঙ্কুদিকে মাঝে মাঝে দেখি ডানলপে, খারাপ লাগে।

এখনো আমার ঘুড়ির পেছনে ছুটতে থাকা বাচ্চা দেখলে হেব্বি ভালো লাগে।

আজও আমি ঘুড়িটা ঠিক করে ওড়াতে শিখিনি।  আজও কোনো বাচ্চা ছেলের ঘুড়ি কেটে গেলে আমার ভীষণ দুঃখ হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top