ম্যাথুকে অদিতিও দেখেছে। সুঠাম চেহারার এই গোয়ানিজ্ ছেলটার চোখদুটো ভারি লাজুক, বড় বড় অগোছালো চুলগুলো অধিকাংশ সময় মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকে। হালকা দাড়িভরা মুখটা ও নীচু রেখেই আড়চোখে দেখে অদিতিকে।
এবারে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে ম্যাথু। ইলেকট্রনিক্স এন্ড ইন্সট্রুমেন্টেশন। এদিকটা বিশেষ আসতে হয়না ছাত্রদের, ওরা অ্যাকাডেমিক ব্লকেই থাকে। নেহাত হোস্টেলের কিছু দাবী-দাওয়া, ক্যান্টিন, হোস্টেলের ইলেকট্রিক বা জলের লাইনে কোন সমস্যা, – এসব নিয়ে ছাত্ররা আসে অ্যাডমিনিসট্রেশন ব্লকে। অদিতির পোস্টিং অ্যাডমিনিসট্রেশনে, রিশেপশন ডেস্কে। তাই এখানে যে ঘরেই কাজ থাকুক যেতে হবে রিশেপশনের সামনে দিয়ে। সেখানে সুন্দরী অদিতি। সামনে দুটো টেলিফোন, হাতে একটা অর্ধেক পড়া উপন্যাস নিয়ে আড়চোখে দেখে নেয় কে কোথায় যাচ্ছে। অদিতির সামনে এমনিতেই অফিসের বেশকিছু লোকের একটা ভিড় থাকে। রেঞ্জটা একেবারে ড্রাইভার থেকে ডিরেক্টর পর্যন্ত বিস্তৃত। কেউ আসে এমনি গল্প করতে, কেউ সিম্পল ঝাড়ি করে, কেউ খুচরো প্রেম করতে চায়(মধ্যবয়সী বাঙালির চিরকালীন এক্সট্রা-ম্যারিটাল স্বপ্ন যেমন হয়), দু-একজন তো আরো একধাপ এগিয়ে ডায়মন্ডহারবার যাবার প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছে। ডিরেক্টর বা সিনিয়র অফিসার-রা অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসেন না, অদিতিকে ঘরে ডেকে পাঠান, মাঝে মধ্যে কফি খেতে নিয়ে যান। অদিতি জানে কে কখন কি উদ্দেশ্যে তার সামনে আসে বা তাকে ডাকে। সবকটা তাকানো সে চেনে। যেকোনো সুন্দরী মেয়ের কমন সমস্যার মতো স্বভাবসুলভ দক্ষতায় সে কাউকে এড়িয়ে চলে, কাউকে পাত্তা দেয়, আবার কাউকে সহ্য করে। এইসব হ্যাংলামি দেখে মাঝে মাঝে সে কিঞ্চিত আনন্দও পায়।
অফিস-স্টাফদের মতো কিছু ছাত্রও তাকে মাপে। কিন্তু ম্যাথু অন্যরকম, লাজুক, সোজাসুজি তাকাতে সাহস পায় না। অনেকসময় আদৌ কোনো কাজ থাকে না, জাস্ট অদিতিকে দেখার জন্যই ম্যাথু আসে, অদিতি বোঝে।
সমস্ত দিনের শেষে অফিস থেকে বেড়িয়ে সইফের সাথে বাড়ি ফেরার সময়, কোথাও বসে টুকটাক কফি খাওয়া আর ঘন্টাখানেক আড্ডা দেবার ফাঁকে, রোজ এইসব গল্পগুলোই সইফকে বলে অদিতি। সইফও মজা পায়, আর গল্প শুনতে শুনতে অদিতির অফিসের প্রায় সবাইকেই জেনে ফেলেছে সে।
তোকে প্রোপোস করা যেকোনো মাঝবয়সী লোকের প্রথম পছন্দ, বল কেন? যার সপ্তায় ছ’টা দিন গড়ে তিন ঘন্টা করে বাসে ট্রামে চেপে অন্যের গায়ের ঘাম মাখতে মাখতে অফিস আর বাড়ি যেতেই কাহিল, বিরক্তিকর অফিসে ততোধিক বিরক্তিকর বস্, বাড়িতে ছেলেমেয়ের হাজার চাহিদা, পনেরো বছরের বিবাহিত মেদওয়ালা বউয়ের সাথে সপ্তাহশেষে একবার যৌনজীবন তাও বিশেষ চারদিন পড়ে গেলে ব্যাজার মুখে টিভি দেখা ছাড়া গতি নেই, তেমন মানুষের জন্য তুই আইডিয়াল। তুই ডিভোর্সি, কিন্তু আর বিয়ে করতে চাস না। একেবারে নিরানব্বই শতাংশ চাপমুক্ত ফ্রি ফ্লো যৌনতা।
সত্যি, মানুষ কি বিরক্তকর জীবন যাপন করে বল্। পরিপাটি করে সাজানো অন্তঃসারশুন্য একেকটা মানুষ। সহজ করে হাসতে জানে না, ভালবাসতে জানে না।
বেসিক্যালি সকলেই খুব একা এবং দুঃখী।
ক্লান্ত আর অসহায়। আর সকলেই কামতাড়িত।
না, হয়তো পুরোটা জেনারালাইস করা উচিত হবে না কিন্তু পরকীয়া সম্পর্কের বেসিক কন্ডিশন যৌনতা।
আর তুই কেন আছিস আমার সাথে?
সেই যে কিন্টারগার্ডেন স্কুলে একসাথে ভর্তি হলাম, বেঞ্চে তোর পাশে বসলাম, আর উঠতে পারলাম না। মাঝখানে ক্লাশ এইট-নাইনে একবার প্রোপোস করেই ফেলছিলাম, তারপর দেখলাম তোর যা গোঁরা হিন্দু বাবা, তোদের বাড়ি গেলেই যেরকম কটমট করে তাকাতো, ধম্ম-টম্মের সমস্যা, কি দরকার চাপ নেওয়ার, কেটে পড়ো। তখন কি আর জানতাম দুবছর পর আবার ফিরে আসবি কোলে বাচ্চা। ব্যাস, আবার সেই তোর পাশের সিট।
অনেকদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে অদিতি ভেবেছে, ভালবাসতে বাসতে সইফও একদিন ক্লান্ত হবে। যদিও ক্ষয়ে যাওয়া অফিস কলিগদের মতো ক্লান্তিকর কোনো সম্পর্ক বয়ে বেড়ানোর দায়বদ্ধতা তাদের নেই। ঠিক তখনই অদিতির মনের মধ্যে ভেসে ওঠে আড়চোখে তাকিয়ে থাকা এক সুঠাম যুবক, দুটো লাজুক চোখ, হালকা দাড়িভরা মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা অগোছালো লম্বা চুল। মাঝে মাঝেই অফিস ছুটির সময় বাসস্ট্যান্ডে এসে দাড়িয়ে থাকে সে, অদিতি আর সইফকে রোজ চলে যেতে দেখে। ভাগ্যিস্, ভালবাসা রোজ কেবল ক্ষয় হয় না, উৎপাদনও হয়।
একবার ভাব করলে হয় ম্যাথুর সাথে, অদিতি ভাবে। সে-ই নাহয় ডেকে কথা বলবে, ক্ষতি কি ! ছাত্র তো। বেচারা এতো ঘাবরে যাবে যে ঠিক করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। কিন্তু কথা আর বলা হয়ে ওঠে না। অফিসের কাজ, বাড়ির ঘ্যানঘ্যানানি, সইফের আবদার, পাঁচ বছরের আয়ুষের পড়াশোনা, টিভির মেগাসিরিয়ালে প্রতি পঞ্চাশ এপিসোড পরপর নায়িকার বিয়ে আর ডিভোর্সের গল্প দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে যায়। কনভোকেশনের দিন ম্যাথু যখন সার্টিফিকেট নিতে স্টেজে উঠলো, অদিতির মনে হলো, সত্যি, সময় কি চটপট কেটে যায়।
হোস্টেল ছেড়ে, ইনস্টিটিউট ছেড়ে চলে যাবার আগে আরো অনেক ছাত্রের মতো ম্যাথুও এলো সবাইকে বিদায় জানাতে। এবং অদিতির কাছে। অদিতি আশ্চর্য হয়ে দেখলো আজ আর ম্যাথু লাজুক নেই। বেশ দৃঢ়তার সাথে শুধু কথাই বললো না, হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য এবং অদিতিকে, শুধু অদিতিকে, উপহার দিল একটা ক্যাডবেরি।
আজকে অদিতির অবাক হবার পালা, সেটা এতটাই যে ক্যাডবেরি হাতে নিয়ে কিছু বলার আগেই চলে গেল ম্যাথু। সেই চলে যাবার সঙ্গে কোথাও যেন একটা বিষন্নতা মিশে রইল অদিতির মনে সারাদিন। সইফকে ফোন করে সে বিকেলবেলায় আসতে মানা করে দিল। ছুটির পর সে পায়ে হেঁটে বেড়িয়ে পড়লো। অনেকদিন পর কলকাতার রাস্তায় পায়ে হেঁটে ঘুরতে খুব ভালো লাগছিল অদিতির। একসময় অনেক স্মৃতি একসাথে জড়ো হয়ে গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠলো। আর, হয়তো অদিতির জন্যই, সন্ধেবেলা হটাৎ একপশলা বৃষ্টি হলো। সেই বৃষ্টিতে ভেজা ছাড়া প্রকাশ্যে এতটা কান্না অদিতি পারতো না।
ক্যাডবেরিটা অফিসের ড্রয়ারেই রয়ে গেল। একদিন, দুদিন, একমাস, দুমাস, একবছর, দুবছর। অনেক নতুন জিনিস সামনে জমতে থাকলো আর ক্যাডবেরিটা ক্রমশঃ পেছনে চলে গেল। ভেতরটা গলে তলতলে হলো, একসময় এক্সপায়ারি ডেট চলে গেল। তারপর যখন একদিন, কি করে কেজানে, পিঁপড়েরা টের পেয়ে এসে ছেঁকে ধরলো, তখন অদিতির খেয়াল হলো যে সেটা খাওয়া হয়নি। আবার মনে পড়লো, সেদিন ম্যাথুকে একটা ধন্যবাদও বলার সুযোগ পায়নি সে।
কি করছে এখন ম্যাথু? একটা ফোন করলে কেমন হয়! সে নিশ্চই খুব চমকে যাবে। অ্যাকাডেমিক ডিপার্টমেন্ট থেকে রেজিস্টার ঘেঁটে সে ম্যাথুকে ফোন করলো। কিন্তু সে নম্বর উপলব্ধ নেই। অথচ তার সাথে একবার কথা বলতে ভীষন ইচ্ছে করছে অদিতির। চেয়ার ছেড়ে উঠে হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্টের কাছে গেল সে। যথারীতি তার কাছেও নতুন নম্বর নেই ম্যাথুর।
ডিপার্টমেন্টের আর কোনো ফ্যাকাল্টির কাছে? সোমেশবাবুর খুব প্রিয় ছাত্র ছিল সে, যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু সোমেশবাবুর কাছেও পাওয়া গেল না।
অদিতিকে বেজার মুখে বসে থাকতে দেখে সোমেশবাবু বলেন, ‘আসলে অন্য স্টেটের ছাত্ররা এখানে এসে একটা লোকাল নম্বর নেয় রোমিং এড়ানোর জন্য। তারপর চলে গেলে নম্বর বদলে ফেলে। তোমার কি খুব দরকার? তাহলে ওদের ব্যাচের কোনো ছেলেকে খুঁজে বের করে দেখতে হবে। কারো না কারো সাথে নিশ্চই যোগাযোগ থাকবে।’
নিজের সিটে ফিরে আসে অদিতি। কাজটা এখন অনেক বড় হয়ে গেল তার। রেজিস্টার হাতরে একটা একটা করে ছেলেকে ফোন করে তাদের কারো থেকে নম্বর জোগার করতে হবে ম্যাথুর।
ভাগ্যিস্, ভালবাসা রোজ কেবল ক্ষয় হয় না, উৎপাদনও হয়।
২০০৭ (সহনাগরিক)
