খিল্লি

পানু ডিমসেদ্ধ খেতে খুব ভালবাসে। আজকে হটাৎ মুশকিলটা হল, একটু তাড়া থাকায়, মা ভেবেছিল ডিমটা হয়তো সেদ্ধ হয়ে গেছে কিন্তু, একটু তলতলে থেকে গেল। ফলে দুটো হাত লাগল ডিমের খোলা ছাড়াতে। আর সেই সুযোগে একটা মশা, পাজি বেআক্কেলে গৃহপালিত রক্তলোলুপ, পানুর খলি গা পেয়ে মনের আনন্দে খেতে লাগল।  পানু মারতে গেল আর অমনি তার মা, শুচিবায়ুগ্রস্থ এবং এঁটোকাঁটার ব্যাপারে ভয়ানক গোঁড়া, চোখ পাকিয়ে উঁহু উঁহু করে উঠল। কি আপদ! পানু না পারে ডিম ছাড়াতে না পারে মশা মারতে। সে আফসোস করতে থাকলো, ইস!! এসময় যদি একটা ল্যাজ থাকত।

ঠিক সেই মুহুর্তে আমাস্টারডামে বিজ্ঞনী রাস্কেল একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ফেলল। ল্যাজ বানানোর মহৌষধ। এর আগে সে ‘পীনিস এনলার্জমেন্ট পিল’ আবিষ্কার করেছিল এবং ভেবেছিল সেজন্য তার নোবেল পাওয়া উচিৎ। কিন্তু ঠিকঠাক লোক ধরতে না পারায় একটুর জন্য সেটি হাত ছাড়া হয়ে যায়, এমনকি পেটেন্টটা অবধি ভাল দামে বেচতে পারেন নি ভদ্রলোক। তাই এবারে বেশ সন্তর্পণে গুছিয়ে সাংবাদিকদের ডেকে আবিষ্কার প্রসঙ্গে জানাল, এই  ‘কক্সিস এনলার্জমেন্ট পিল’–টির কার্যপ্রক্রিয়া আগেরটির ঠিক বিপরীত অর্থাৎ দেহের সন্মুখভাগে নয়, পশ্চাৎভাগে এবং এটি আগের ওষুধের থেকে চারগুন বেশি শক্তিশালী, কারণ সুদৃশ ল্যাজ এর দৈর্ঘ যৌনাঙ্গের চতুর্গুন হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

প্রথম পাতায় হাসপাতালে মড়া, শেষ পাতায় ভারতের হারা, হোম লোন, কার লোন, সস্তায় মোবাইল প্রভৃতি বিজ্ঞাপন এর মাঝখানে ‘ল্যাজ চাই!’ শীর্ষক খবরটি, সংক্ষিপ্ত কিন্তু উত্তেজক, পড়ে নড়েচড়ে বসল হরিপদ। বউকে ঘুম পারিয়ে ছেলেকে লুকিয়ে সাউন্ড মিউট করে অনেক রাত অব্দি ফ্যাশান টিভি দেখে চোখ কটকট তথাপি, আবার সকাল সাত টার মধ্যে উঠতে হয়েছে তাকে। পূবের ব্যলকনিতে বসে কাগজ পড়া তৎসহ  চা খাওয়া, যদিও চা তো ছুতো, আসলে কোনাকুনির ফ্ল্যাটে বারান্দায় সমর এর স্ত্রী রীনা, যে আবার জনপ্রিয় টিভি অ্যাঙ্কার, তার হাতকাটা রাত্রিবাস পরে এসে প্রাতঃকালীন আড়মোড়া ভাঙার আশায় আধঘুমন্ত হরিপদ ল্যাজ এর খবরটা পড়ে লাফিয়ে উঠলো। এবার! মনিকা, তার সেক্রেটারি কাম প্রেমিকা, আর তাকে ল্যাজ কাটা হনুমান বলতে পারবে না।  একমুহূর্ত দেরি না করে, সমরের স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে, নিজের পৃথুলা স্ত্রীকে বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে, সাতসকালে সে মনিকাকে টেলিফোন করল।

মনিকার মেজাজ টা এমনিতেই বিগড়ে ছিল। গত মাস থেকে ঋতুবন্ধ, একটা অনিশ্চিত আশঙ্কা, – আবার মেরী স্টোপসের উটকো ঝামেলা, তার ওপরে পানু, যে তার থেকে বয়সে ছোট হলেও তার সাথে খুচরো প্রেম করতে মনিকার মজা লাগে, সাতসকালে এসে বায়না ধরেছে চুমু খাবে। এত ভোরে চুমু খেতে মোটেই রাজী নয় মনিকা,  তদুপরি মন খারাপ, এমন সময় ফোনটা বেজে উঠলো। মনিকা ফোনটা ধরল, হটাৎ বেদম রেগে গেলো, চারঅক্ষরের একটা গালাগালি দিল, তারপর ফোন টা কেটে দিল। পানু দেখল, শুনল, কিন্তু কিছুই বুঝল না। মনিকা বুঝল কিন্তু কিছুই বলল না। দুজনই আরও খানিকটা গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইল। মনিকা ভাবতে থাকল একটা নতুন চাকরী খুঁজতে হবে। পানু ভাবতে থাকল একটা নতুন প্রেমিকা খুঁজতে হবে। তারপর একসময় পানু বলল ‘নাহ! উঠি’। মনিকা বারণ করল না। পানু বাইরে এসে, যেহেতু চুমু খাওয়া হল না তাই, ফুটপাথের দোকান থেকে ডিমসেদ্ধ কিনে খেতে লাগল।

ডিম খাওয়ার এরকম অপমানজনক কারনে প্রকৃত সত্বাধারিকারী আর্থৎ মুরগিটি খুব অসুন্তুষ্ট হল। সে স্থির করল পাশবাধিকার কমিশনের কাছে নালিশ জানেবে। যদিও রাজাকে জানাতে পারলে সবথেকে ভাল হত কিন্তু বঙ্গদেশে সিংহ বিরল, একমাত্র চিড়িয়াখানায়, তাও আবার কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী হওয়ায় অলস এবং দিবানিদ্রাসুখগ্রস্থ। তাই মুরগী পোলট্রি ফার্মের মালিকের কাছে থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে সুন্দরবনে ‘অ্যানিম্যাল কিংডম’- এর রিজিওনাল আফিসে বাঘের সাথে দেখা করতে গেলো।

ডব্লু ডব্লু এফ থেকে ফ্যাক্স এসে পড়েছিল। ব্যাঘ্রাচার্য বৃহল্লাঙ্গুল দপ্তরে এসে নিয়মিত অভ্যাসে এটাওটা দেখতে দেখতে হটাৎ চিঠিটা পড়ে উত্তেজিত হয়ে পড়লো। ‘তাই বলে মানুষেরও ল্যাজ হবে? – ইয়ে বাত কুছ হজম নেহি হুয়ি। ভগবানকে পটিয়ে বেশী করে বুদ্ধি নিয়ে, সারা পৃথিবী দখল করে, বাকি সব জন্তুদের জঙ্গলে পাঠিয়ে ফুর্তি করছে, – আমাদের গর্ব বলতে এক টুকরো ল্যাজ, সফিস্টিকেটেড হনুমানগুলোর তাও সহ্য হচ্ছে না। অবিলম্বে এর প্রতিবাদ হওয়া প্রয়েজন…..’ সন্ধ্যায় আয়জিত এক পশুসভায় সে একটা জ্বালাময়ী ভাষণ দিলো। কিন্তু উক্ত সভায় ল্যাজের ভিত্তিতে পশুকুলে একটা বিভাজন দেখা গেল। ল্যাজযুক্ত পশুরা পরদিনই মহাকরনে মন্ত্রীমশাই এর কাছে প্রতিবাদলিপি দেবার আভিযান স্থির করলো। ল্যাজহীন পশুরা ঠিক করলো আমস্টারডামে বিজ্ঞানী রাস্কেলের কাছে গিয়ে জানাবে যাতে তিনি সাবল্টার্ন  জীবদের জন্যেও কিছু করেন। আর ময়ূরী, মুরগী প্রভৃতি নারীবাদী সংগঠন যারা দীর্ঘদিন ধরে তাদের পুরুষদের গৌরবময় ল্যাজের বিরুদ্ধে সরব ছিল, তারা কিছুটা সুবিধাবাদী তাই, সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে সময় চাইলো।

সুন্দরবন থেকে পায়ে হেঁটে ক্যানিং, সেখান থেকে লোকাল ট্রেন চেপে শিয়ালদা, তারপর দুটো কলা, চারপিস পাউরুটি, দুটো লাড্ডুর প্যাকেট গ্রহণ করে দল বেধে মহাকরণ। মানুষের মিছিলের জন্যে নিয়মকানুন থাকলেও পশুদের জন্যে স্পষ্ট কোন বিধিনিষেধ করেননি প্রশাসন। স্বভাবতই পুলিশ প্রথমে ওপরতলার আদেশের অপেক্ষায় এবং পরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মিছিল দেখতে থাকলো। তাছাড়া গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে রিজার্ভ ফরেস্টে গেলেও এমন বৈচিত্রময় পশুসমাবেশ দেখতে পাওয়া যায় না। কিন্তু ওদিকে রাস্তা জুড়ে জ্যামজট হলো এবং বলা বাহুল্য সেই জ্যামে আটকে পড়ল হাসপাতালযাত্রী, পরীক্ষার্থী, মন্ত্রী, বিচারপতি এবং হরিপদ।

গাড়ির মধ্যে আটকে বসে থাকতে হরিপদর খুব ভালো লাগছিল। এভাবে যদি আজ অফিস যাওয়া না হয় কি মজা! এভাবে যদি কালও না যাওয়া হয়, যদি পরশু, তরশু, বা তারপরে কোনদিন আর অফিসে না যেতে হয়, তবে তাকে মনিকার মুখোমুখি হতে হবে না। অর্থাৎ মনিকা তাকে ইস্তফাপত্র দিতে পারবে না। অর্থাৎ মনিকা চিরকাল তারই থেকে যাবে। দুনিয়া কাঁপানো একটি কম্পানির প্রধান সে, মনিকা তার সেক্রেটারি, সহবাসে যতই অসম্মত হোক তবু, হিলারিয়াস–দর্শন স্ত্রী ছাড়াও তার জীবনে যে একজন উদ্ভিন্নযৌবনা প্রেমিকা আছে – এতেই তার আনন্দ।

যানজটের অন্যপ্রান্তে মিনিবাসে সুহৃদের পাশে বসে মনিকা কিন্তু সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললো।

মনিকা : চলো আমরা বিয়ে করি।

সুহৃদ :  বিয়ে ? বেশতো প্রেম চলছিলো!

মনিকা :  আমি চাকরিটা ছেড়ে দিচ্ছি। নতুন  একটা চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত আমার কিভাবে চলবে?              

সুহৃদ :  কিন্তু কদিন পরে যদি আমারও চাকরি চলে যায়? আমিও যদি আর চাকরি না পাই?

মনিকা :  তখন না হয় মিউচুয়ালি ডিভোর্স করে তুমি একজন চাকরি করা মহিলা আর আমি একজন চাকরি করা পুরুষ খুজে নেব।

মনিকার এই সিদ্ধান্তে পানু খুব দুঃখ পেল। বান্ধবী তার আর একজন আছে বটে, কিন্তু তাকে চুমু খাওয়া অনেক হ্যাপা। তার উত্তর কলকাতার বনেদি গায়ের রং প্লাস্টিক পেইন্টসের মতো ঝকঝকে, তাই সে যখন তখন রোদে বার হয় না। আবার আকাশে মেঘ থাকলেও সে ঘরে থাকে কারণ বৃষ্টির জল পায়ে লাগলে হাজা হয়। শুষ্কতায় রুক্ষতায় ত্বক যদি ফেটে যায় সেইভয়ে সে শীতকালেও বাড়ীর বাইরে বের হয় না। এর উপর সে আবার কবিতা লেখে আর বিকেল বেলায় ঝিলের ধারে ফিফটিসের বাঙলা ছবির নায়িকার মতন ট্র্যাডিশনাল ভঙ্গিতে বসে জোড় করে হয় নিজের লেখা কবিতা নয় রবিঠাকুরের গান শোনায়। এতকিছুর পরে পানুর আর চুমু খাওয়া হয় না। সে ডিমসেদ্ধ কিনে খায় আর ভাবে, জীবনে সে কখনো বলেনি ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর, – মাধমিকে ফাস্ট হতে চায় নি, সুপার লোটোর জ্যাকপট জিততে চায় নি, সরকারের কাছে চাকরির আবেদন করেনি, ভগবানের কাছে দেখা পেতে চায়নি, – শুধু ডিমসেদ্ধ খাওয়ার মতন কয়েকটা টাকা আর চুমু খাওয়ার মতন কয়েকটা বান্ধবী, – তাও এত দুর্লভ।

পানুর মতো সমরেরও আজ মন ভাল নেই। আজ তার প্রথম বিবাহবার্ষিকী, অথবা শেষ। সে জানে রীনা ইতিমধ্যে উকিলের সাথে কথা বলে ডিভোর্সের কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছে। এক বছরের অপেক্ষা ছিল, হয়তো আজই সে সমরকে কাগজগুলো দিয়ে সই করতে বলবে। টিভি অনুষ্ঠানের এক পরিচালককে রীনা বিয়ে করবে। যানজটের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে যেকোনো  ত্যাজ্য-স্বামীর মতোই সমরের ইচ্ছে করলো রীনাকে শেষবারের মতো অকল্পনীয় কিছু একটা একটা উপহার দিতে।

ভাগ্যিস টিকিটটা কাটা হয়নি, জ্যামে আটকে লোকেরা যেই বুঝল বাস নট্ নড়ন চড়ন, আনেকেই নেমে গেলো। সমরও অন্যমনস্ক হয়ে বাস থেকে নেমে গুটি গুটি অগ্রসর হলো আর তারপরেই ভারতবর্ষের পশুকুলে এমন ‘বৈচিএের মধ্যে ঐক্যবোধ’ দেখে বিমুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

মিছিলে হটাৎ সে ভুলুকে দেখল। ছোট্ট কুকুরটা পাতি ক্যালসেশিয়ানের মতন দেখতে কিন্তু রঙটা ধবধবে সাদা, ওরিয়েন্টাল কমপ্লেক্সনে এমনটা ঠিক দেখা যায়না। রীনা কুকুর ভালবাসে, সমরের মনে হল আজই সব থেকে ভাল দিন। সে ভুলু কে কাছে ডাকলো এবং তার বাড়িতে যাবার প্রস্তাব দিলো। ভুলুরও আর কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগছিলো না, পুরসভার আত্যাচারে রাস্তা থেকে খাবার জোগার করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছিল, তাই যখন দক্ষিন কলকাতার একটা ফ্ল্যাট পাওয়াই যাছে তদুপুরি একটা বউদি যে নাকি আবার টিভি অ্যাঙ্কর মানে সুন্দরীই হবে, ভুলু সে প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলো।

ভুলু কে পেয়ে রীনার খুব আনন্দ হল। ‘লোকটা সত্যিই তাকে কতো ভালোবাসে,’ এই ভেবে সে রাত্রে বিছানায় শুয়ে বেশ কিছুক্ষন ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদল। তারপর রাত দুটোর সময় পরিচালক বন্ধুর মোবাইলে ফোন করে ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকলো। (অন্য এক উঠতি অভিনেত্রীর সাথে) পরিচালক মশাই তখন সবেমাত্র শুয়েছিল, এমন সময় ফোনে ঘণ্টাখানেক ধরে রীনার দুঃখের স্ক্রিপ্ট তার ভদকার নেশাটা ছুটিয়ে দিলো। একে বিয়ে করলে যে কি দুরবস্থা হবে, সেই কথা ভাবতে ভাবতে পরিচালকের হিসি পেল। একসময় বিরক্ত হয়ে সে ফোনটা কেটে দিলো। যেহেতু ছেলেরা চিরকালই স্বার্থপর, তারা মেয়েদের দুঃখ কোনদিন বুঝবে না তাই, রীনা ঠিক করলো কারো কাছে সে থাকবে না। সমরকেও সে ছেড়ে যাবে আর নতুন বিয়েও সে আর করবে না, তার বদলে সে পশুদের নিয়ে একটা এনজিও খুলবে এবং ভুলু হবে তার প্রথম মেম্বার। যদিও ভুলুর মতামতটাও জরুরী কারণ সুন্দরী বউদি পেয়ে তো সে খুশিই, কিন্তু  আরও খুশি কোনাকুনির ফ্ল্যাটে হরিপদের একটা সাদা লোমওয়ালা কুকুর দেখে, এতটাই, যে সারাক্ষণ সে বারান্দাতেই রয়েছে।

গোলার্ধের অন্যপ্রান্তে তার মতো আরও একজন, বিজ্ঞানী রাস্কেল, সারাটা রাত ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রইল। যথারীতি এবারও সে পেটেন্ট বিক্রি করতে পারেনি শুধু তাই নয়, এবারও সে নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনীত হবে না শুধু তাই নয়, পশুজগতে তুমুল প্রতিক্রিয়া – আত্মহুতির হুমকি – ইকসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রাখতে রাষ্ট্রপুঞ্জর হস্তক্ষেপ শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানী হিসাবে তার স্বীকৃতি বাতিল শুধু তাই নয়, আগামীকাল তার বান্ধবীও তাকে ছেড়ে চলে যাবে।

‘শুধু যাওয়া আসা শুধু স্রতে ভাসা’, – কলকাতার রাস্তায় বহমান বিপুল পশুস্রোতের দিকে তাকিয়ে গুন গুন করে গান গাইছিল পানু। এমন সময় রীনা, টিভি চ্যানেলের হয়ে মিছিলের ছবি তুলতে এসে একটা হাতিকে পাশ দিতে গিয়ে, হুড়মুড় করে পানুর গায়ে এসে পড়লো। সে একেবারে হিন্দি ছবির ক্লাইম্যাক্স দৃশ্য। শট–টা স্লোমোশান করে পরপর তিনবার জুড়ে দিয়ে পানু ভয়েসওভার বসিয়ে দিলো, ‘ তোমার অনুচ্চ গুলফভাগ, সংহত উরুদয়, গম্ভীর নাভিপ্রদেশ, উন্নত নাসিকা, লোহিতবর্ণ অপাঙ্গ, কর, চরণ, জিহ্বা ও অধর, শ্যামল বর্ণ অঙ্গ, নিবিরতম নিতম্ব ও পয়োধর, কুটিল পক্ষরাজি, কম্বুর ন্যায় গ্রীবা এবং মুখমণ্ডল পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় রমণীয়। তুমি যক্ষরমণী কি দেবকামিনী? গান্ধর্ব্বী কি অপ্সরা? ভুজঙ্গবনিতা কি এই শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা?’

এটাই লাস্ট শট। গল্প শেষ হয়ে গিয়ে এখানেই ফ্রিজ হয়ে যাবার কথাছিল কিন্তু হটাৎ সকালবেলার সেই মশাটা, ল্যাজহীন অথচ দলের হুইপ অমান্য করে টিফিন খাবার লোভে মিছিলে ঢুকে পড়া বদমাশ এবং আনরোম্যান্টিক, কোথা থেকে উড়ে এসে সিকোয়েন্সটা ঘেঁটে দিলো। পানু আবার সেটাকে মারতে গেলো আর অমনি রীনা, পশুপালন এনজিও এবং বিশ্বমৈত্রীর বানী প্রচারে সংকল্পবদ্ধা, উঁহু উঁহু করে উঠলো। মশা যথারীতি পালাল। রীনা উঠে দাঁড়িয়ে, ধুলো ঝেড়ে পোশাক ঠিক করতে এই অনাচ্ছিকৃত ঘটনার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করলো। পানু যদিও এত দুঃখের কোনো কারন খুজে পেল না, বিরক্তিকর গতানুগতিক সারাটা দিনের শেষে এই পড়ে যাওয়া বরং তার ভালোই লেগেছে। রীনা পানুর মুখের কাছে ক্যামেরা এনে মাইক্রোফোন ধরে মানুষের ল্যাজ প্রসঙ্গে পানুর মতামত জানতে চাইলো। পানু দুদিকে মাথা নাড়লো, তার কিছুই বলার নেই।

উড়ে চলে যাওয়া মশা, দূরে চলে যাওয়া মনিকা, ধীরে হেঁটে যাওয়া রীনা, ভিড়ে হেঁটে যাওয়া জীবজন্তু, এরা সবাই এরপর বাড়ি যাবে। এবং পানু। পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে দেখল মাত্র পঁয়ত্রিশ টাকা পরে রয়েছে। সে ভাবলো কাগজে একটা ‘শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন’ দিলে কেমন হয়? একটুকরো কাগজ আর পেন নিয়ে সে লিখতে শুরু করলো; “কলকাতাবাসী ২৯/৫’৯” স্নাতকোত্তর বেকার পাত্রের জন্য ৩০/৩৫ বছরের মধ্যে চাকুরিরতা গাঢ় কৃষ্ণবর্ণা…’

(এর বেশী লেখা এই টাকায় হয় না)।

২০০৩ (সহনাগরিক)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top