সে যখন আসে, আমাদের বাড়িতে সমস্ত কাজের মধ্যে দৈনিন্দিনতার ছন্দপতন ঘটে। সে যখন আসে, আমরা অনিচ্ছাকৃত কিছু প্রয়োজনীয় নিয়মমাফিক আতিথেয়তা পালন করি। সে যখন আসে, আমরা অপেক্ষা করি তার চলে যাবার দিনটার।
সে বোঝে, তবু সে আসে। বা তাকে আসতে হয়। কারন নিয়মটা আমাদেরই বানিয়ে দেওয়া।
আমাদের সংসারে আমি, বাবা আর মা। ছোট্ট এবং ছন্দবদ্ধ। আমাদের প্রতিদিনের কাজ খুব রুটিনমাফিক। সকালে ঘুম ভেঙে ওঠা থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়া অব্দি সমস্ত কাজগুলো আমরা রোজ একই রকম ভাবে মেনে চলি। আর যখন সেগুলো এলোমেলো করতে হয়, তখন…
আমার মা চাকরী করে। খুব দায়িত্বের পদ, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। সেকসনের কর্মচারীদের অ্যাটেন্ডেন্স থাকে মার কাছে। এবং অনেক আলমারির চাবিও। তাই অফিসে মাকে তাড়াতাড়ি যেতে হয়। তা সত্বেও মা রান্না করতে খুব ভালোবাসে। তাই নিজেই রান্না করে। আমাদের বাড়ীতে যে কাজ করে, সে ঘরদোর মোছে, বাসন মাজে, কাপড় কাচে। তবু কিছু কাজ তো থাকেই যা মাকে করতে হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন মাকে রীতিমতো হন্তদন্ত হয়েই যেতে হয় অফিসে।
সে এলে রান্নার পরিমান বাড়ে। তার অলসার অছে, ঝাল খায় না। আমার বাবা আবার আঝালা খেতে পারে না। দুরকমের রান্না মাকে করতে হয়। তার বয়স আশির কাছাকাছি। তার চানের জল, হাত মুখ ধোয়ার জল সব এগিয়ে গুছিয়ে দিতে হয়। চা করতে হয় রোজের থেকে বেশিবার। এরকম আরো অনেক কাজই বেড়ে যায়, …অফিস লেট্।
মা সবই করে, কিন্তু কারো সাথে একটি বা দুটির বেশি কথা বলে না। অনেক সময় সহজ কথাতেই খুব চটে যায়। বিশেষকরে অফিস থেকে ফিরে এসেই যখন আবার রান্নাঘরে ঢুকতে হয়।
আমার বাবা একটু হিসেবী। ‘টাকা বাড়ছে’ ভাবতে বাবা খুব ভালোবাসে। যদিও অনেক টাকা রোজগার করার জন্য বাবা এদিক ওদিক ছোটে না। তার যা কিছু সঞ্চয় সবই ব্যাঙ্কে। মাইনের টাকা পেয়েই বাবা আগে ব্যাঙ্কে রাখে। এরপর প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে টাকা তুলে সংসার খরচ করে। এতে কিছু সুদ বেশি পাওয়া যায়। বাবা কখনো সপ্তাহে বেশি খরচ করে না। নিতান্ত দরকার পড়লে মার কাছ থেকে ধার নেয়। পরের সপ্তাহে শোধ করে দেয়।
সে যখন আসে, খরচ বাড়ে। বাবার হিসেবের গ্রাফ নামতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই বাবার মেজাজটাও চড়া থাকে। সে যেদিন চলে যায়, সেদিন বাবা আবার হিসেব নিয়ে বসে।
একটা সময় ছিল যখন আমি খুব চাইতাম যে সে আসুক। আমি তখন স্কুলে পড়তাম। সে এলে পড়াশোনা হতো খুব অল্প, গল্প হতো বেশি। উপরন্তু সে যখন যেত তখন কিছু না কিছু আমাকে অবশ্যই কিনে দিত। তাই তখন তার আসাটা আমার কাছে খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু এখন আমি বড় হয়ে গেছি। আমার নিজের একটা ঘর আছে। সেই ঘরে রাতে আমি একা শুই। পড়াশোনা করি। সে এলে আমার খাটটা তাকে ছেড়ে দিতে হয়। ছোটবেলায় তার সাথে শুতাম। শুয়ে শুয়ে সে আমাকে গল্প বলতো। তার দেশ কোথায় ছিল – তার ছেলেবেলা কেমন কেটেছে – ইংরেজরা কেমন ছিল – সে স্বদেশী আন্দোলন করেছে কেমন করে – কোন কোন বিপ্লবীকে সে কাছ থেকে দেখেছে, – এমনি আরো কত কি! এখন আমি লম্বা হয়ে গেছি। একটা খাটে হয় না। আর সেইসব গল্পগুলোও পুরোনো হয়ে গেছে। আমায় শুতে হয় সোফা কাম বেডে। বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন বিষয়ে খুঁতখুঁত থাকে, কেউ যেমন ঝকঝকে বাথরুম না হলে পটি করতে পারে না, আমার তেমনি নিজের খাট না হলে ঘুম হয় না। আমি আবার একটু ঘুম কাতুরে, সোফায় শুতে তাই ভীষণ অসুবিধে হয়। এরপর আরো নানা অসুবিধে তো থাকেই, রাতের বেলা নিজের ঘরে আলো জ্বেলে আমি গল্পের বই পড়ি, সে এলে তা হয় না, এছাড়া কেবল টিভি তে রাতে ইংরেজী সিনেমা থাকে, সে এলে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। আমিও অপেক্ষা করি কতক্ষণে সে চলে যাবে ।
‘খুব রাগ হয় না? এই বুড়োটার ওপর!’ হটাৎ ই আজ একটু অন্যমনস্ক লাগছিলো তাকে, ‘এই আজকে আমি যাবো, তারপর মাত্র একটা মাস কাটতে না কাটতেই আবার আমি এসে হাজির। দীর্ঘ একটা মাস। আবার শাস্তি। অবশ্য তোমাদেরই বানিয়ে দেওয়া নিয়ম। আমার কিছু করার নেই।’
আমি মৃদু প্রতিবাদ করি, ‘না না, শাস্তি বলছ কেন?’
‘এটাতো শাস্তিই সোনা। তোমার, আমার, সবার। আমি বুঝি। তোমার মায়ের কত কাজ বেড়ে যায়, তোমার পড়াশোনা নষ্ট হয়, ঘুম নষ্ট হয়, আমি বুঝি। কিন্তু কি করব বলো! যতটা ভোগ করতে হবে, ততটা ভোগ করতেই হয়। আমার বড়ছেলে যখন মারা গেল, সবাই বললো, এই বুড়ো বয়সে আর কেনইবা বেঁচে থাকা! মিছিমিছি শোক পাওয়া –’ উদাসভাবে বলে চলে সে, ‘আমিও কি চাই আর বেঁচে থাকতে! আমিও চাই চলে যেতে। কিন্তু আমিতো ভীষ্মদেব নই, মৃত্যু আমার ইচ্ছাধীন নয়।’
‘তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে?’
‘এটা কারো বলার কথা নয় বাবা, এটা নিজের কথা। বোধ। মাথার ভেতরে একটা বোধ কাজ করে। একথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমি অপ্রয়োজনীয়। তবে হ্যা, একটা জোড় অবশ্য আমার আছে, যা নিয়ে একমাস অন্তর অন্তর তোমার বিছানাটা এসে দখল করি, বলো সেটা কি? ব্লাড। আমার রক্ত, আমার জিন তুমি নিয়ে চলেছ। আমি ছিলাম বলে কিন্তু তুমি আছো।’
আমার দাদু।
আজ সকালে চলে গেছে। যদিও আমরা সবাই চাইছিলাম তার চলে যাওয়া, তবু কেন জানিনা মনটা খারাপ হয়ে আছে। যখন কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না, ভাবলাম সারদ্রকে একটা ফোন করি –
‘হ্যালো সারদ্র… না না এমনিই ফোন করলাম…’
গত একমাস ধরে যে গল্পের বইটা পড়ার কথা ভাবছিলাম, সেটা আজ আর পড়তে ইচ্ছে করছিল না, যে সিনেমাগুলো দেখার কথা ভাবছিলাম, সেগুলোও ভালো লাগলো না, নিজের অতিপ্রিয় বিছানায় শুয়ে সেই বহুইপ্সিত মধুরতম নিদ্রার মধ্যেও হারিয়ে যেতে পারছিলাম না কিছুতেই ।
‘…আসলে মনটা ভালো নেই রে ! আমার দাদু আজ সকালে মারা গেছে… দশটা একচল্লিশ…’
১৯৯৬ (সহনাগরিক)
