প্রোজেক্টটা আমি লিখে ফেলেছি। নবীণ উদ্যোগপতিদের আর্ন্তজাতিক মহাসম্মেলনে উপস্থিত হবার জন্য প্রয়োজন ছিল একটা ইনোভেটিভ বিজনেস প্রোপোসাল। সবথেকে ইনোভেটিভ বলে যেটা বিবেচিত হবে, সারা পৃথিবীর ব্যাঙ্ক তাকে ফাইনান্স করবে। অংশগ্রহণকারী সমস্ত দেশ সেটা রেপ্লিকেট করবে। এমন মহাসুযোগ আমি হাতছাড়া করিনি। বাঙালীর বদনাম যে সে ব্যবসা করত পারে না, কিন্তু নতুন কিছু ভাবতে পারে না এমনটা হয়নি। আমার সামনে এটাই চ্যালেন্জ, একটা শ্রেষ্ঠ ভাবনাকে বানিজ্যিক করে তোলা। আমার স্বপ্নের প্রোজেক্ট, ‘ইন-হিউম্যান হ্যাচারি’।
পোলট্রি ফার্মের হাস-মুরগির মতো আমার এখানে প্রচুর প্রচুর অমানুষ উৎপাদন এবং প্রতিপালন হবে। মনে রাখবেন, এরা কিন্তু কেউই রোবট বা না-মানুষ নয়। এরা সকলেই রক্ত মাংসের মানুষের মতো, কিন্তু অমানুষ। আর অমানুষ শব্দের সাথে যেমন জড়িয়ে আছে অসভ্যতা, অসহিষ্ণুতা, অমানুষিকতা, এরা কিন্তু তার উল্টো। বরং এরা সবাই ধীর স্থির শান্ত এবং অন্যের জন্য বলিপ্রদত্ত। এরা মিছিল মিটিং করবে না, প্রতিবাদ করবে না। এবং যেহেতু রোবটের মতো প্রোগ্রামড্ নয়, বরং একপ্রকার সহনশীল ক্রীতদাস, এদের অপমান করলে ‘অনুকুল’-এর মতো ইলেকট্রিক শক দিয়ে মেরে ফেলবে না, নিশ্চুপ থাকবে।
আমি দেখেছি প্রতিটা মানুষ প্রত্যেক মুহুর্তে অসম্ভব অপমানিত, লাঞ্ছিত। রণে বনে জলে জঙ্গলে, যে কোনো মানুষ সুযোগ পেলে একে অন্যকে অপমান করতে ছাড়ে না। দুর্বল কিম্বা দলিত, অপমান করার মজাই আলাদা। অফিসে উর্দ্ধতন তার অধঃস্থনকে, এভাবে নামতে নামতে সেই অপমান বাসের কন্ডাকটর এমনকি বাড়ির কাজের মাসি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এবার জাস্ট ভাবুন অফিসে এমন একটা অমানুষ আছে যাকে সবাই অপমান করতে পারে। ইচ্ছে করলে চর ঘুষি লাথি মারা যাবে, মুখে থুতু ছেটানো যাবে, সে কিছু বলবে না। কি আনন্দ না! অর্থাৎ প্রত্যেক অফিসে আমার প্রোডাক্টের একটা ডিম্যান্ড থাকবে।
শুধু অফিস কেন, সম্পন্ন লোকজন বাড়িতেও একটা অমানুষ রেখে বীভৎস আনন্দ পেতে পারেন। কাজ না পারলে মনের আনন্দে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিন। মুরগি বিক্রেতা যেমন আড়ৎ থেকে তিরিশটা মুরগি কিনে উল্টোকরে সাইকেলে ঝুলিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যায়, আমার প্রোডাক্ট ও তেমনি উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া যাবে যতক্ষণ না তার নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেড়িয়ে মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু হত্যা নয়, কারন আমার অমানুষগুলো আসলে সব প্রোডাক্ট। ইনহিউম্যান, তাই মানবাধিকারের কোনো দাবী এদের থাকবে না। বাজার থেকে একটা জ্যান্ত মুরগি কিনে এনে যেমন আপনি একটা একটা করে পালক ছিঁড়তে পারেন, তেমনি আমার প্রোডাক্টেরও আপনি চুল ছিঁড়তে পারবেন, নোখ উপরে নিতে পারবেন, ছুঁচ ফোটাতে পারবেন, – এককথায় যা যা ইচ্ছে করতে পারবেন।
আমার প্রোডাক্ট খুব ভালো ব্যবহার করা যাবে যৌনসমস্যা সমাধানে (যদিও মনে রাখবেন এটি কিন্তু জাপানী তেলের বিকল্প নয়)। প্রথমে অফিস ভাবুন, বসের সুন্দরী সেক্রেটারী আছে, তার প্রতি ছোঁকছোঁক আছে, ওদিকে বাড়িতে বৌ আছে, ফোর নাইন্টি এইট কেস আছে, যৌন হয়রানির অপবাদ আছে, – আমার কাছে সমাধান আছে। আবার যে বস নয়, যার সেক্রেটারী নেই, সাধারণ কর্মচারী, অথবা উল্টোটা, অফিসে অনেক মহিলা অথচ একটা সুঠাম সুপুরুষ নেই, – প্রয়োজনে চাঁদা তুলে আমার প্রোডাক্ট কিনুন। অফিসে যাবার আগ্রহ বাড়বে, কাজ করার উদ্যম বাড়বে, কর্মসংস্কৃতি ফিরে যাবে। যেহেতু অমানুষ, সমকাম উভয়কাম বিকৃতকাম কিছুতেই আপত্তি করবে না। এবার অফিসের বাইরে ভাবুন। বাসমালিক কন্ডাক্টর হিসেবে আমার অমানুষ রাখতে পারেন। ভিড় বাসে চিঁড়েচ্যাপ্টা, তার মধ্যে এক সহযাত্রী অসভ্যতা শুরু করলো, চ্যাঁচামিচি হাঙ্গামা, কন্ডাক্টর অমনি তাকে নিজের কাছে ডেকে নিল, ব্যাস্ সমাধান। আমার প্রোডাক্টের হাত ধরে রাত বারটার সময় দিল্লীর রাস্তায় সিনেমা দেখে ফিরতে কোনো সমস্যা নেই, ফাঁকা বাসে উঠতে কোনো বিপদ নেই, বিপদ নেই তাই ধর্না নেই, মোমবাতির মিছিল নেই, পুলিশের হয়রানি নেই, মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নেই, আদালতের ফাঁসীর হুকুম নেই, তার উচিত অনুচিত নিয়ে সভ্য মানুষের উদ্বেগ নেই, গাদা গাদা নিউজপ্রিন্টের খরচ নেই।
শুনেছি একসময় মানুষ নরখাদক ছিলো। সে পুরোনো খাদ্যাভ্যাস আমি ফিরিয়ে আনতে পারি। তাতে আনেক গরু ভেড়া শুয়োর ছাগল মুরগীর জীবন বাঁচবে। যেসব রাজনৈতিক দল গবাদি পশুর প্রতি সংবেদনশীল, তারা নিশ্চই আমাকে সমর্থন করবে। তাছাড়া একটা মুরগী কেবলমাত্র একটা পরিবারের প্রয়োজন মেটায়, একটা অমানুষ অন্ততঃ দশটা পরিবারে মাংস যোগাবে। ‘ক্যানিবাল হলোকাস্ট’ নামে একটা সিনেমা আছে, দেখেছেন? মাথার ঘিলু বেশ চাকুম চুকুম করে খাওয়া যায়। অমানুষের মাংস দিয়ে ক্রমশঃ অনেক সুস্বাদু পদ তৈরি হবে। ভাবতে পারছেন, আমার ব্যবসার হাত ধরে গড়ে উঠবে কত অনুসারী শিল্প।
আমার অমানুষের সবথেকে বড় ক্লায়েন্ট হবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। সেখানে প্রতিমুহুর্তে ধর্মের নামে প্রচুর মৃত্যু, প্রচুর রক্তক্ষয়। ভাই ভাইকে মারছে, ছেলে বাবাকে। হাজার হাজার বাপ-মা হারা শিশু এতিমখানায়, উদ্বাস্তু শিবিরে অনুরূপ মৃত্যুপ্রতীক্ষায়। চোখের সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, কন্যাকেও। এসবের কোনো দরকার আছে বলুন? আমার প্রোডাক্ট নিন, যেমন খুশি যেভাবে খুশি মারুন, জয়োল্লাস করুন, তারপর উৎসব মিটে গেলে সেইসব মৃতদেহ একজায়গায় জড়ো করে পাহাড় বানিয়ে ট্যুরিষ্ট স্পট করে দিন। দেশের অর্থনীতি ফিরে যাবে। সেই টাকা দিয়ে আরো বন্দুক কিনুন, আরো কার্তুজ, আরো অমানুষ।
হুঁ হুঁ বাবা! ব্যবসা করতে জানতে হয়। খালি আইডিয়া ভাঁজলে হয়না, প্রসপেক্টিভ ক্লায়েন্ট ও ঠিক রাখতে হয়। একটা ভিশন চাই, তারপর নিড অ্যাসেসমেন্ট করতে হয়, ক্রাইসিসটা পয়েন্ট আউট করতে হয়, স্ট্রাটেজিক মার্কেটিং দরকার। নয়তো কুড়ি বছর আগে কখনো ভেবেছিলেন যে জল কিনে খেতে হবে? এখন খেটে খাওয়া গরীব মানুষও রাস্তায় বেরোলে বোতলের জল কিনে খায়। কদিন বাদে দেখবেন প্যাকেজড্ হাওয়া বিক্রী হচ্ছে। শুদ্ধ বাতাস। ইনফ্যাক্ট আমার নিজেরই তো পরিকল্পনা আছে, এই ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেলে, যখন আমি পৃথিবীর প্রথম কয়েকজন ধনী ব্যক্তির তালিকায় পৌঁছে যাবো, কোম্পানীর কর্পোরেট স্যোশাল রেসপন্সিবিলিটি হিসেবে একটা ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট শুরু করবো। একটা কারখানা, যে বাতাস থেকে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা আরো যাকিছু দুষিত কণা টেনে নেবে। তারপর প্রসেসড্ করে বাতাসে পরিমানমতো অক্সিজেন পাঠিয়ে দেবে।
তখন সারা পৃথিবী জুড়ে সুবাতাস। আপনাকে আর নাকে মাস্ক পরে রাস্তায় হাঁটতে হবে না কারন কোথাও কোনো পলিউশান নেই। আপনি নির্বিচারে গাছ কাটুন, তথাপি আপনার সন্তান শহরের ব্যস্ততম রাস্তার মোড়ে বন্ধুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে দীর্ধ শ্বাস নেবে, বান্ধবীর চুলের মায়াবী আঘ্রাণ…
যদি সে বন্ধু অমানুষও হয়, বলুন, এমন দিন আপনি চান না?
২০১৫ (সহনাগরিক)

অনুভূতি শূন্য মানুষই অমানুষ, এমনিতে খুবই সহজলভ্য একটি বস্তু।মান আর হুশ থাকার বিপদ প্রচুর , চার পাশের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয় , তার জন্য আবার সময় নষ্ট হয় , বিনোদনের সময় টান পড়ে। তার চেয়ে , ভগবান ( এই যুগে শাসক) যা করেন ভালোর জন্যই করেন বলে পাসকাটানোর মানুষ এত বেশি যে মনে হয় এই প্রকল্প বহু দিন ধরেই চলছে
অসংখ্য ধন্যবাদ অয়ন। অন্যান্য লেখাগুলোয় মতামতের অপেখ্যায় রইলাম।