রবীন্দ্র চিন্তার সাম্প্রতিক অভিমুখ: সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ

সাহিত্যের বয়স চলচ্চিত্রের অনেক বেশি। বাঙালি র সাথে চলচ্চিত্রের পরিচয় ১৮৯৭ সালে, আর রবীন্দ্র সাহিত্যের সাথে পরিচয় তারও বেশ কিছুটা আগে।এর প্রায় দুইদশক পরে , চলচ্চিত্র যখন ধীরে ধীরে সাবালক হয়ে উঠেছিল,বা বলা যায় খন্ড দৃশ্য বা স্বল্প দৈর্ঘ্যের চিত্র ছেড়ে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কাহিনী নির্মানের চেষ্টা করছিল তখন থেকে সাহিত্যের সাথে সিনেমার গাঁটছড়া বাঁধা শুরু।এ সময়ে চলচ্চিত্রের যে কটি ধরন আমরা পাই তা মূলত পৌরাণিক কাহিনী নির্ভর, জীবনীভিত্তিক এবং সামাজিক সাহিত্য নির্ভর।এর মধ্যে তৃতীয় ধারাটি সবথেকে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সাহিত্যের এক বিপুল সম্ভার বাংলা ছবিকে শুধু সমৃদ্ধই করে না, অন্য ভারতীয় ছবির থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে স্বতন্ত্র করে দেয়।

সিনেমার গত একশো বছরের সময়কালকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভেঙে নিতে পারি।নির্বাক যুগ,সবাক ছবির স্টুডিও যুগ এবং স্বাধীনতা উত্তর আধুনিক চলচ্চিত্র। (ডিজিটাল মাধ্যমের সাম্প্রতিক সময়কে এই আলোচনায় সচেতন ভাবেই বাদ রাখলাম।)

বাংলা ছবির কাহিনী নির্বাচনে বঙ্কিম এবং শরৎ সাহিত্য কিন্তু এগিয়ে ছিল রবীন্দ্র সাহিত্যের থেকে। শরৎচন্দ্রের কাহিনী নিয়ে যত ছবি তৈরি হয়েছে রবীন্দ্র সাহিত্যের ক্ষেত্রে সে সংখ্যা নিতান্তই কম।নির্বাক যুগে আমরা মোট পাঁচটি ছবি পাই যা রবীন্দ্র কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত। সেগুলো হলো যথাক্রমে মানভঞ্জন (১৯২৩, পরি: নরেশ মিত্র), বিচারক (১৯২৮, পরি: শিশির কুমার ভাদুড়ি), বলিদান (১৯২৭, পরি: নাভাল গাঁধী), গিরিবালা (১৯২৯, পরি: মধু বসু) এবং নৌকাডুবি (১৯৩২, পরি: নরেশ মিত্র)।

সংখ্যার এই অনধিক্যের একটা কারণ হতে পারে সাহিত্যের নিরীখে বয়সে নবীন এই সিনেমা মাধ্যমটির  শিল্প গুনের প্রতি রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট আস্থাশীল ছিলেন না,বা তাঁর নিজের লেখা কাহিনীর যে কটি চলচ্চিত্রায়ণ তিনি দেখেছিলেন অথবা তাঁর ঘনিষ্ঠ জন বা অনুরাগীদের মন্তব্য শুনেছিলেন বা পড়েছিলেন তা খুব প্রীতিকর ছিল না। তাঁর প্রথম ছবি মানভঞ্জন তীব্র ভাবে সমালোচিত হয়েছিল। দ্বিতীয় ছবি বিচারক নিন্ম রুচির অজুহাতে ছাড়পত্র পায়নি দীর্ঘদিন । ছবির পরিচালক শিশির কুমার ভাদুড়ীর পঞ্চম ভ্রাতা মুরারি মোহন ভাদুড়ীকে লেখা চিঠিতে তিনি তাঁর অসন্তোষ প্রকাশও করেছিলেন। বাস্তবিক বাংলা সিনেমা তখনো তার নিজের ভাষা তৈরি করতে সক্ষম হয়নি ‌। সাহিত্যের ভাষা নির্ভর করে ইন্টারটাইটেল সহযোগে মুক্তি ই ছিল তার তখনকার রূপ।

 চলচ্চিত্র মাধ্যমটির সম্ভাবনার কথা রবীন্দ্রনাথ অবশ্য অনুধাবন করেছিলেন। তাই ১৯২৯ সালে মধু বসু যখন পুনরায় মানভঞ্জন কাহিনী নিয়ে ‘ গিরিবালা ‘ নির্মানে সচেষ্ট হন তখন চিত্রনাট্য রচনায় রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেন। সেই সময়ে তাঁরই নাটক ‘তপতী ‘র চিত্রনাট্য রচনাতেও তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। পরিচালনা করার কথা ছিল ধীরেন্দ্রনাথ চট্টপাধ্যায়ের। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক ছবি টি নির্মিত হয়নি। অধিকাংশ পাশ্চাত্য চলচ্চিত্র রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল নিম্নরুচির। অন্যদিকে হিমাংশু রাই-র ‘ লাইট অফ এশিয়া’ দেখে উনি মুগ্ধ হয়েছিলেন।পরে ১৯৩০ সালে হিমাংশু রাই র অনুরোধে জার্মানি তে একটি প্যাশান প্লে দেখার পর হোটেলের ঘরে বসেই রচনা করেছিলেন একটি চিত্রনাট্য যা পরে কাব্য রূপে প্রকাশিত হয় ‘দ্য চাইল্ড’ নামে। যদিও এই ছবিটি ও শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি।

১৯৩১ সালে নিউ থিয়েটার্সের আবির্ভাবের সময় থেকে বাঙলা সবাক চলচ্চিত্র যুগের সূচনা। এসময় বা বলা যায় ১৯৫০ সাল অবধি আমরা দশটি রবীন্দ্র সাহিত্যের চিত্রায়ন পাই। এরমধ্যে ১৯৩২ সালেই নিউথিয়েটার্সের প্রযোজনায় আমরা পাই নটীর পূজা যা পরিচালনা করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এগারো রিলের এই ছবিটি নির্মাণের জন্য তিনি পাঁচ দিন নিউথিয়েটার্সে এসেছিলেন- তিনদিন শুটিং এবং দুদিন সম্পাদনার কাজে। যদিও শিল্পগুন বা বাণিজ্য কোনো পরিপ্রেক্ষিতেই ছবিটি সফল হয়নি। স্টুডিও যুগের বাকি ছবি গুলো হলো যথাক্রমে দেনাপাওনা (১৯৩১, পরি: প্রেমাঙ্কুর আতর্থি), চিরকুমার সভা ( ১৯৩২ পরি: প্রেমাঙ্কুর আতর্থি), খোলা(১৯৩৮ পরি: নরেশ মিত্র), চোখের বালি (১৯৩৮ পরি: সতু সেন), শোধবোধ(১৯৪২ পরি: সৌমেন মুখোপাধ্যায়), শেষ রক্ষা (১৯৪৪ পরি: পশুপতি চট্টোপাধ্যায়), নৌকাডুবি (১৯৪৭ পরি: নীতিন বসু), দৃষ্টিদান ( ১৯৪৮ পরি: নীতিন বসু), বিচারক (১৯৪৮) ।

স্বাধীনতা উত্তর আধুনিক বাংলা সিনেমায় আমরা কয়েকজন পরিচালককে পাই যারা চলচ্চিত্রকে শিল্পের স্তরে উন্নীত করেছিলেন। এদের হাত ধরে বাংলা সিনেমা তার নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছিল যে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। বাংলা ছবি যেমন তার আঞ্চলিকতার সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে তেমনই কিছু পরিচালকের মুন্সিয়ানায় রবীন্দ্র সাহিত্যও বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করল। এদের মধ্যে অগ্রগন্য সত্যজিৎ রায়। রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র (১৯৬১) নির্মাণ ছাড়াও তিনি তিনটি কাহিনী চিত্র নির্মাণ করেন রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে। সেগুলি হল যথাক্রমে তিনকন্যা (১৯৬১), চারুলতা(১৯৬৪) এবং ঘরে- বাইরে (১৯৮৫)। এই একই সময়ে আমরা আরও কিছু কৃতি পরিচালক দের পাই যারা রবীন্দ্র সাহিত্যের ভাষা কে সার্থক ভাবে রূপান্তরিত করেছিলেন চলচ্চিত্রের ভাষায়। তাঁরা হলেন তপন সিংহ (কাবুলিওয়ালা ১৯৫৭, ক্ষুধিত পাষাণ ১৯৬০, অতিথি ১৯৬৫), পূর্ণেন্দু পত্রী (স্ত্রীর পত্র ১৯৭৩, মালঞ্চ ১৯৮২), পার্থপ্রতিম চৌধুরী (সুভা ও দেবতার গ্রাস ১৯৬৪)। যেহেতু এই আলোচনার মূখ্য উদ্দেশ্য রবীন্দ্র চর্চার সাম্প্রতিক অভিমুখ তাই আমরা উল্লেখ করব একবিংশ শতাব্দীর কয়েকটা ছবির যথা চোখের বালি ( ২০০৩, পরি: ঋতুপর্ণ ঘোষ), চতুরঙ্গ (২০০৮,পরি: সুমন মুখোপাধ্যায়), এলার চার অধ্যায় (২০১২,পরি:বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায়), শেষের কবিতা ( ২০১৫, পরি: সুমন মুখোপাধ্যায়) এবং তাসের দেশ (২০১২ পরি: Q)। এরমধ্যে  শেষোক্ত ছবিটি বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ পরিচালক Q এর ভাষায় ‘ ছবিটি মূল সাহিত্যটির বিনির্মাণ।

একটি দীর্ঘকালীন অমীমাংসিত বিতর্ক হল, একটি চলচ্চিত্র মূল সাহিত্যের কতটা দায়ভার বহন করলে সেটিকে সাহিত্যের সঠিক চলচ্চিত্রায়ণ বলে গণ্য হবে, বিশেষ করে তা যদি হয় রবীন্দ্র সাহিত্য?

নিজের ছবি চতুরঙ্গ প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারে সুমন মুখোপাধ্যায় বলেছেন,’ If you notice how Shakespeare is reinvented in the West- it is a revolution. But Tagore has just been out of the copyright a few years back. It is difficult for Bengalis to accept any new intervention regarding Tagore.” তপন সিংহ তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন অতিথি ছবির শেষ উনি বদল করেছিলেন এবং সেজন্য তাকে অনেক সমালোচিত হতে হয়। আবার আইজেনস্টাইন মনে করেন,” A minor work has no claim to act as more than a spring board when adapted for another medium, but a major deserves that any approach is made with respect for its essence. The scenario must emerge as clearly as possible, an honour to the original, to our process of transportation and to cinematic art.”

এই সমস্ত কিছু স্মরণে রেখে আমরা রবীন্দ্র সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ প্রসঙ্গে ফিরব। আমাদের আলোচনার লক্ষ্য এই নয় যে মূল কাহিনীর কি কি বদল ঘটেছে চলচ্চিত্রে, বরং আমরা খুঁজতে চেষ্টা করব পরিচালক কিভাবে দর্শককে আরেকবার নতুন করে পরিচয় করাচ্ছেন কাহিনীটির সাথে।

রবীন্দ্র কাহিনী নিয়ে সত্যজিতের প্রথম ছবির প্রথম   গল্প ‘ পোস্ট মাস্টার’ । গল্পে রতন ও পোস্ট মাস্টারের যে সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তা অত্যন্ত জটিল। সিনেমায় সে সম্পর্ক অনেকটাই সরল, নন্দ বাবু রতনকে বোনের মতো ভেবেছেন (রতন আমার রতন/ তার কাজে বড়ই যতন/ সে আমার বোনের মতন)। গল্পে রতন বারো তেরো বছরের একটি  বিবাহ যোগ্যা , যার ‘নারী হৃদয় কে বুঝিবে’ কিন্তু সিনেমায় সত্যজিৎ রতন কে নারী হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখান  তা লেখাপড়া জানা , গান গাইতে জানা নন্দ বাবু র বোন রাণীর মতন। ছবিটি শেষে রতনের সেই আত্মমুক্তির স্বপ্ন ভঙ্গের আখ্যান হয়ে ওঠে। তাই মূল গল্পে বিদায় কালীন যে টানাপোড়েন পোস্ট মাস্টার ও রতনের  মধ্যে চলে ছবিতে তা দ্রুত ঘটে। গল্পে ‘ পোস্ট মাস্টার তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন – একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুন মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্ব ব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যাথা প্রকাশ করিতে লাগিল। একবার নিতান্ত ইচ্ছা ছিল ফিরিয়া যাই , জগতে ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনী কে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি।’ অনুরূপভাবে রতন ও ‘ সেই পোস্ট অফিস গৃহের চারদিকে কেবল অশ্রুজলে ভাসিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। বোধ করি তাহার মনে ক্ষীণ আশা জাগিতেছিল , দাদাবাবু যদি ফিরিয়া আসে…।’ ছবির শেষে সত্যজিৎ খুব সহজেই রতনকে আবার কাজের লোক বানিয়ে দিলেন একটি মাত্র সংলাপে , ” নতুন বাবু ,জল এনেছি”।

দ্বিতীয় গল্প ‘ মণিহারা ‘-তেও তিনি যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন তা হ’ল , রবীন্দ্র কাহিনীটি আদৌ ভূতের গল্প ছিল না । গল্পে কথক একজন জীবিত ব্যাক্তিকে গল্পটি শোনান যিনি স্বয়ং গল্পের নায়ক ফণীভূষণ সাহা এবং গল্প শেষে তিনি তার স্ত্রীর নাম ‘ নৃত্যকালী ‘ বলামাত্র গল্পটি পারলৌকিক বিশ্বাসের ধোঁয়াটে জগৎ থেকে সরে যায় । কিন্তু ছবির শেষে সত্যজিৎ ফণীভূষণকে হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়ে আসলে দর্শককে একটি বিশ্বাসযোগ্য ভূতের গল্প বলতে চান ।

‘চারুলতা ‘ তে সত্যজিৎ মূল গল্পের (নষ্টনীড় )প্রভূত পরিবর্তন করেন । এই নিয়ে লেখালেখিও রয়েছে অনেক । এমনকি ‘পরিচয় ‘ পত্রিকায়  সমালোচনার  প্রেক্ষিতে  সত্যজিতের নিজের লেখা প্রবন্ধ আছে ‘ চারুলতা প্রসঙ্গ ‘  তার ‘ বিষয় চলচ্চিত্র ‘ বইটিতে , যেখানে উনি দীর্ঘ ব্যাখ্যা করেছেন কি পরিবর্তন এনেছেন এবং কেন । কাহিনীতে অমল শুরু থেকেই ভূপতির বাড়ীতে থাকে , উমাপতি সুকৌশলে টাকা সরায় , অমল যেই চারুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘ সহস্র হস্ত গভীর গহ্বরে পা বাড়াইতে যাওয়া ‘ -র সামিল বুঝতে পারে তখনই বিয়ে করে বিলেত যাওয়ার সম্মতি দেয় , অমল চলে যাবার পর ছ’টি পরিচ্ছদ জুড়ে চারুর বিরহজ্বালা বর্ণিত হয় , এবং শেষ পর্যন্ত চারুকে ত্যাগ করে ভূপতির মহীশুর যাত্রা – এসবই  ছবিতে বদল করেন সত্যজিৎ । পরিচালকের কথায় , ‘ সাহিত্যের কাহিনীকারের স্বাভাবিক সুযোগগুলি গ্রহণ করে ভাষার প্রসাদগুণে রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনাবলীর মধ্যেও যে Suspension of disbelief সৃষ্টি করতে পেরেছেন , তা চলচ্চিত্রকারের সাধ্যের অতীত ।’ চারুর নিঃসঙ্গতাকে সত্যজিৎ বর্ণনা করলেন সিনেমার ভাষায় , যেখানে আমরা দেখি ছবির প্রথম সাত মিনিটে একটি মাত্র সংলাপ , বাকি পুরোটাই দৃশ্যকল্প যা ফুটিয়ে তোলে চারুর একাকীত্ব , ভূপতির সাথে তার দূরত্ব । ছবিতে অমল আসে ঝড়ের মতো , ছবিতে উমাপদ সিন্দুক ভেঙ্গে চুরি করে , ছবিতে অমল আগেই বুঝতে পারে তার প্রতি চারুলতার প্রেম , তার পরেও সে দাদার সংসারে কিছুদিন থাকে । ছবির শুরুতে রুমালে লেখা ‘ B ‘ আসলে একটা নির্দেশ, এ শুধু ভূপতি-র নামের আদ্যাক্ষর নয় , তার প্রিয় লেখক বঙ্কিম (যার সাহিত্য চারুর ও অমলের কাছাকাছি আসার একমাত্র মাধ্যম ), এবং অমলের চলে যাবার আগে  ‘ B ‘  অনুপ্রাসের খেলা (যা অমল ও চারুর শেষ দীর্ঘ কথোপকথন ) তাদের সম্পর্কের পরিণতি স্পষ্ট করে দেয় । ছবিতে অমল বিদায় নেয় ভূপতির ব্যবসায় বিপর্যয়ের পর । এরপর আসে ছবির শেষপর্ব যা পুরোটাই বদলে ফেলেন সত্যজিৎ , যার ব্যাখ্যা উনি উক্ত প্রবন্ধে দিয়েছেন । তার মতে , নষ্টনীড়ের থিম চারুলতায় অটুট রয়েছে । একথা অনস্বীকার্য , গত একশো বছরে রবীন্দ্রসাহিত্যের যতগুলি চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে ,   ‘ চারুলতা ‘ শ্রেষ্ঠতম ।

চারুলতা প্রসঙ্গে তার বক্তব্য যেমন ছিল ,  ‘ it is an interpretation ,  A transcreation ,  not  a translation ‘  কিন্তু  ‘ ঘরে বাইরে ‘  ছবিতে  সত্যজিৎ সাহিত্যের অনুগত ছিলেন । যেটুকু সামান্য বদল ছিল , শেষ দৃশ্যের নির্মাণে । যদিও সত্যজিৎ বলেছেন , সাহিত্যের কোনো সংলাপ তিনি ছবিতে ব্যবহার করেন নি ।

চলচ্চিত্রায়নের  সময় তপন সিংহ রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রতি সর্বদা অনুগত থেকেছেন । একজন পাঠক হিসেবে তিনি যেভাবে কাহিনীকে আত্মস্থ করেছিলেন , একজন দর্শকের সাথে তিনি সেভাবেই ছবিকে পরিচয় করিয়েছেন । ছবি যেহেতু অনেক কংক্রিট মাধ্যম, সেখানে  দর্শকের কল্পনার স্থান কম,  তাই  ‘ ক্ষুধিত পাষাণ’  ছবিতে আমরা প্রেমের একটি পূর্ণাঙ্গ আখ্যান পাই যা মূল কাহিনীতে বিস্তৃত ছিল অনেক বিচ্ছিন্নভাবে , এমনকি শেষপর্যন্ত বৃদ্ধের কাছ থেকে  ‘ গুলবাগের একটি ইরানি ক্রীতদাসী ‘ র গল্প লেখকের শোনা হয়নি ট্রেন চলে আসার কারণে ।

পূর্ণেন্দু পত্রী রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে যেদুটি ছবি করেন তার মধ্যে স্ত্রীর পত্র ছবিটি উল্লেখযোগ্য।   ‘ He was actually among those talented Indian makers who looked upon cinema as a” total art form ” the purpose of which is to carry a message to the mass involving different mediums of art. And in this film he incorporated all those mediums he had been in love with.  Streer Patra was based on Tagore’s one of the most revolutionary and futuristic text’ রবীন্দ্রনাথ  গল্পটি  লিখেছিলেন একটা  চিঠির মতো যদিও পরিচালক ছবিটি বানান চিরায়ত গল্প বলার ঢঙ-এ , যা সমালোচকের মতে , ” This mode of narration may have caused loss of straightforwardness or intrinsic boldness in some places , inherent in the original text.” গল্পে ‘ বড়োজা ‘ বা ‘ বিন্দু ‘ র মতো ছবির চরিত্ররা কুশ্রী ছিলেন না । তাছাড়া নিজে একজন কবি হওয়ায় পূর্ণেন্দু ছবিতে ‘মৃণাল ‘এর কবিসত্তা প্রকাশ করায় বিশেষ যত্নবান ছিলেন । পাশাপশি ছবিতে স্বপ্নদৃশ্য রচনায় গ্রাফিক্সের ব্যবহার শিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রীকে মনে করিয়ে দেয় । ছবির গল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে বিবিধ শিল্পমাধ্যমের প্রয়োগ পরিচালক করেছিলেন অত্যন্ত সুচারু দক্ষতায় ।

“After all one can’t help accepting that as a visual artist Pattrea was brilliant in the film.  He left his signatures all over it including the title-card using calligraphy and other artworks.”

রচনাকালের পরিপ্রেক্ষিতে নষ্টনীড় আর চোখের বালি সমসাময়িক । যদিও চারুলতা নির্মানের প্রায় চল্লিশ বছর পরে চোখের বালির চিত্রায়ন , যখন চারুলতা অবিসংবাদিত ভাবে পৃথিবীর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবির অন্যতম , এবং কোনো তুলনা নয় তথাপি , চোখের বালি ছবিতে  কিছু কিছু propsএর ব্যবহার যেমন অপেরা গ্লাস , দোলনা প্রভৃতি ঋতুপর্ণর ভাষায় ‘ tribute’ , যা হতে পারে রেফারেন্স হিসাবে আমরা পাই । কিন্তু সে অন্য আলোচনা , আমরা খুঁজবো ঋতুপর্ণ কিভাবে চোখের বালি উপস্থাপন করলেন । ” In this adaptation of Chokher Bali , Rituparna Ghosh attempts a negotiation with the ‘ women question ‘ that occupies a central position in the discourses of nationalism .” ঋতুপর্ণর চোখের বালি আসলে এই কেন্দ্রীয় চরিত্র বিনোদিনীর আখ্যান । ছবি মুক্তির কয়েকমাস আগে ধারাবাহিক লেখা ‘ আমার বিনোদিনী ‘ তে তিনি বলেন কিভাবে তিনি ছোটবেলা থেকে তৈরি হওয়া ‘ রসবতী , রসিকা , প্রিয়া ‘ র বোধকে তার চলচ্ছবির বিনোদিনীতে সঞ্চার করেন । যদিও সমালোচকের মতে, ‘ He is rather keen to produce a passion play , based on the sexual forays of a young Hindu widow .”১০ সমালোচকরা আরো মনে করেন , উপন্যাসের নায়িকার যে আত্মসম্ভ্রম ছিলো , সিনেমার বিনোদিনীতে তা অনুপস্থিত । ‘ Instead Rituparna made Binodini virtually a nymphomaniac .’১১ যে যৌনবোধের দ্বারা আমাদের প্রাত্যাহিক জীবন নিয়ন্ত্রিত , সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনযাত্রায় সেই বোধের যে প্রভাব এবং কনফ্লিক্ট , তা বারবার ছবিতে ফিরে আসে সধবা-বিধবা , অম্বাবুচি-বিজয়ার সিঁদুরদান , সাদা পোশাক- লাল পোশাক প্রভৃতি বিভিন্ন অনুসঙ্গে । আবার অম্বাবুচীর দিন বিনোদিনীর রজঃশলা হওয়া ( সে যৌন সক্ষম , বাড়ির বাকি বিধবাদের মতো নয় ) বা ছবির শেষদিকে কাশীতে আশালতা ও অন্নপূর্ণার সংলাপের মাধ্যমে মাসিক বৃত্তান্ত ( যা জানান দেয় আশা গর্ভবতী ) ছবিকে বহুলাংশে লঘু করে দেয় । ছবিতে পুরুষ শরীরের প্রদর্শনও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য । বিশ্বজিৎ রায় লিখেছেন -” নারীপুরুষের শারীরিকতার যে প্রদর্শন চোখের বালিতে রয়েছে তা যৌনতার বর্তমান রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত … ঋতুপর্ণ যৌনতা প্রকাশের যে ভাষা তৈরি করলেন তা সাম্প্রতিক ভারতীয় ছবির বিপণন কৌশল নিয়ন্ত্রিত ।”১২

কাহিনীর শেষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। ঋতুপর্ণ চেয়েছিলেন একটা ‘ unresolved ending, narratively’। তাঁর কথায় -‘ I think a woman can live on her own completely. She does not require a male surname, or little, or appendage of any kind to help her lead her life.  She has gone through relationships, she has goes through a marriage, and nothing has helped her.  What has helped her to be herself is her own self and accomplishments, her strength, her enigma.  She should have gained the courage to live by herself.  In the letter she writes when she leaves, Binodini mentions her own desh , which is not ‘ country ‘ , it should not be translated or read as country , it should be read as space , a space or domain . ” সমালোচক কৌস্তুভ বক্সী মনে করেন , ” Talking into consideration the structure of the film as a whole , in terms of both its traditional and dissident elements , we may conclude that Chokher Bali does open up new avenues of exploring the possibilities  of female gaze in Indian cinema .” ১৩

ছবিতে গল্প বলার সময় রবীন্দ্রকাহিনীতে খুব বেশি রকমের বদল ঘটান নি সুমন মুখোপাধ্যায় , যেমনটি  Q (কিউ) করেছিলেন তাঁর তাসের দেশ ছবিতে । ২০১২ সালে মুক্তি পায় ‘ তাসের দেশ ‘। Rediff.com -এ ছবির শিরোনাম ছিল: ‘Tasher Desh is bizarre, brave and brilliant’. রবীন্দ্রসাহিত্যের এমন চলচ্চিত্রায়ন , ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি, Mise-en-sense , সংগীতের সুর ভেঙ্গে নতুন উপস্থাপন , এতো ক্লাসিক টেক্সট নিয়ে এতো পরীক্ষানিরীক্ষা ইতিপূর্বে আর কোনো বাংলা ছবিতে হয়নি । Tagore’ s 1932 play is a remarkable progressive one , and Q’ s adaptation starts off slow and visceral and then- after they land on the island halfway through the film- changes gears to become a racy, lucid and sexy adventure …. but the film is staggeringly original.১৪ Times of India-র রিভিউতে লেখা হয়, ‘ This is Tagore’s classic tale of transformation reinterpreted as a surreal quest for love and freedom ….. new voice of Bengali cinema . … The filmmaker uses subversion as a cinematic technique to turn the tables of Tasher Desh, as it were.  Under his gaze , the fable gets a fabulous transformation , as lines between dream and reality are blurred in a mash-up of stunning visuals , music and intense performance …. the film’ s beast unto itself .  Q has reached out across the globe to bring together a diverse group of musician — to create an eclectic soundscape.  Rabindrasangeet is twisted, moulded, hammered, beaten and whisked into never-before-seen textures through classic rock, rap, blues and folk strains. ‘

দীর্ঘ একশো বছর ধরে রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠের যে অভ্যাস , তার এহেন ব্যতিক্রমী প্রয়াস , খুব স্বাভাবিকভাবেই বাঙালী দর্শকের আনুকূল্য পায়না । TOI তাই লেখে , ‘ Hell , this is one heck of Tagore trip .  Do watch it. ‘

নির্দেশিকা:

১। ‘বিসর্জন’ নাটক অবলম্বনে এই ছবিটি নির্মিত হয়েছিল।  ‘বিশ শতকের বাংলা ছবি’ বইটিতে  ‘বিসর্জন’ (১৯২৮) বাংলা ছবির উল্লেখ আছে। হতে পারে দুটি একই ছবি, এক বছর পরে বাংলা ইন্টারটাইটেল সহযোগে কলকাতায় মুক্তি পায়।

২। ‘চতুরঙ্গ’ চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে সুমন মুখোপাধ্যায় এর সাক্ষাৎকার, ibid.

৩। ইভর মন্টেগু লিখিত ‘উইথ আইজেনস্টাইন ইন হলিউড’ গ্রন্থ দ্রষ্টব্য। অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘চলচ্চিত্র সমাজ ও সত্যজিৎ রায়’ পৃষ্ঠা ১৫ থেকে সগৃহীত।

৪। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর রেফারেন্স ছবিটিকে অন্যভাবে পড়তেও সাহায্য করে, ‘ At a more discursive level, the whole film can be seen to be engaged in a dialogue with one of Bankim’s essays, ‘Women, Old and New’, a major statement on what is known as the ‘Women’s Question’ in the nineteenth century…. Bankim’s ‘Women Old and New’ was published in 1879 (Ray gives an exact time for the events, 1879, as we know from the dateline on the copy of the magazine that Bhupati shows Amal) where he argues for a new woman who would be modern in the traditional way. She would embody the resolution of the conflict between tradition and modernity by finding her place in a re-invented patriarchy. She would learn to be the new old woman.’ (Writing on the Screen: Satyajit Ray’s Adaptation of Tagore, Moinak Biswas).

৫।  Film Eve, Satyajit Ray. Quoted in Rabindranath O Chalachitra.

৬। ‘On Streer Patra’ by Sridarshini Chakraborty, Silhouette Magazine (web edition) December 29 2011.

৭।  ঋতুপর্ণ ঘোষের ইন্টারভিউ; asiasociety.org

৮। ‘Cinematic adaptation of Rabindranath’, by Somdatta Mondal, Silhouette Magazine (web edition), December 29 2011.

৯।  রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ই মে, ২০০৩।

১০। See Chakravarti, Uma, ‘Gender, Caste and Labour: The Ideological and Material Structure of Widowhood’, Martha Alter Chen, ed., Widows in India, Social Neglect and Public Action , New Delhi, Sage Publications, 1998, pp 75 – 76.

১১। ‘Playing Passion Over Penance – Re-viewing Chokher Bali (1902-2002)’, by Aishika Chakraborty, Silhouette Magazine 10 Nov 2012.

১২। ‘ যৌনতার রাজনীতি’, বিশ্বজিৎ রায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ নভেম্বর, ২০০৩।

১৩।    Silhouette: A Discourse on Cinema, 9:3 (2011)

১৪। The Telegraph dated 23.08.2013

গ্রন্থপঞ্জি:

১। তপন রায়,  বিশ শতকের বাংলা ছবি, কলকাতা,বাপী।

২। সোমেশ্বর ভৌমিক, রূপের কল্পনির্ঝর সিনেমা আধুনিকতা রবীন্দ্রনাথ, কলকাতা, আনন্দ, ২০১১

৩। অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়, চলচ্চিত্র সমাজ ও সত্যজিৎ রায়, ২য় খন্ড, আসানসোল, ফিল্ম স্টাডি সেন্টার, ১৯৯৫

৪। সত্যজিৎ রায়, বিষয় চলচ্চিত্র, আনন্দ, ১৯৮২

২০২২ ( শারদীয়া মনকথা)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top