পাঁচটা কিনলে একটা ফ্রি

চলন্ত ট্রেনে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে আরেকটু হলেই পা ফসকাচ্ছিল তারাপদ। বাঁহাতে লজেন্সের প্যাকেট, ভাগ্যিস ডানহাতে গেটের রডটা শক্ত করে ধরতে পেরেছিল, নয়তো আজ একটা কেলেঙ্কারী হতো। লোকজন হাঁ হাঁ করে উঠল, গেটে দাড়িয়ে ঠান্ডা হাওয়া গায়ে মাখতে মাখতে, তারাপদও মেনে নিল,তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, এভাবে রিস্ক নেওয়া তার উচিত নয়। কিন্তু এছাড়া কি বা করার ছিল। শিয়ালদা থেকে ডানকুনি যাবার এটাই শেষ ট্রেন, মিস করলে বাসে চেপে তার বাড়ি পৌঁছানো এতরাতে অসম্ভব। আর বাড়ী তাকে যেতেই হবে, নয়তো তার বৌ হাইপারটেনসান-এর রুগী, জাস্ট দুশ্চিন্তা করে মারা যাবে।

ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ট্রেনের ভেতরটা দেখে নিল সে। প্রায় ফাঁকা, হাতে গোনা কয়েকজন। শীতকালের লাস্ট ট্রেন এরকমই অবশ্য রোজ থাকে। তবু রোজই একবার সে নিয়মকরে লজেন্স বিক্রির কথাগুলো আউড়ে যায় কামরার এমাথা থেকে ওমাথা অব্দি। দু-একটা বিক্রিও হয় কোনো কোনোদিন। আজ, যেকোনো কারনেই হোক তার আর বকবক্ করতে ইচ্ছে করল না। দিনটা এমনিতেই খারাপ। সারাদিন লজেন্স বেচে শ’দেড়েক টাকা মোটামুটি লাভ হয় রোজ, আজ সাকুল্যে পঞ্চাশ টাকা লাভ হয়েছে কিনা সন্দেহ, হাতে ধরা প্যাকেটে থেকে যাওয়া লজেন্স দেখে বেশ বুঝতে পারছে সে। তারওপর চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে একটু আগে যেভাবে হড়কাচ্ছিল…, মনটা এখন একটা বিড়ি খেতে চাইছে। কিন্তু যেহেতু যাত্রীকামরায় বিড়ি খাওয়া যাবে না তাই, সে একটা সিটে গিয়ে বসে।  

নতুন নাকি এই লাইনে?

তারাপদ তাকিয়ে দেখে সামনে মাফলার মুরি দেওয়া এক ভদ্রলোক। তারাপদ কি বলবে বুঝে পায়না।

যেভাবে উঠলেন, হকারদের তো এমন হয় না।

মাঝে মাঝে হয়ে যায়, বয়স তো হচ্ছে।

আপনাকে তো কখনো দেখিনি। ডানকুনি লাইনে লজেন্স বললে সবাই মুখার্জীকে চেনে। আমি আবশ্য সন্ধে সাতটা পাঁচের ট্রেনটায় যাই। আজ খুব দেরী হয়ে গেল।

আমি অত ভিড়ে পারিনা। সন্ধেবেলা শিয়ালদাতেই থাকি, এখন লাস্ট ট্রেনে বাড়ি ফিরি।

বাড়ি কোথায় আপনার?

রাজচন্দ্রপুর স্টেশন থেকে নেমে মিনিট দশেক আরো যেতে হয়। সাইকেলটা ওখানেই রাখা থাকে, তাই ট্রেনটা হুড়মুড়িয়ে ধরতে হলো। আপনার?

তা ঠিক, এই ট্রেনটা না পেলে মুষ্কিল আপনার। আমার বাড়ি বরানগরে।

ট্রেনটা এবার বিধাননগর স্টেশনে ঢোকে। দু-একজন লোক ওঠে যদিও কেউ তারাপদর দিকে আসে না। বরং পাশের একজন উঠে গেটে চলে যায়, বোধহয় দমদম নামবে।

অনেক সকালে বেরোন নাকি?

না না সকালে আর কে লজেন্স খায়? আমি দুপুরে বেরোই। আগে কোম্পানীতে গিয়ে লজেন্স তুলি, তারপর রাত অব্দি যেটুকু বিক্রি হয়।

কতগুলো লজেন্স আছে আপনার প্যাকেটে?

দেড়শোটা থাকে, ধরুন শ’খানেক  বিক্রি হয়েছে আজ, খোলা প্যাকেটে খান পঞ্চাশ আছে। আর একটা প্যাকেট তো খোলাই হয়নি।

এতে চলে যায়? না সকালে অন্য কিছু করেন?

অন্যদিন দেড়-দু প্যাকেট বিক্রি হয়, আজ খুব কম হয়েছে। তবে সকালে আর কিছু করি না, এতে যা হয় তাই দিয়েই চলে কোনক্রমে। একসময় উইমকো ফ্যাক্টরীতে কাজ করতাম, লকআউট হবার পর যেটুকু টাকা ছিল, একটা মেয়ে, বিয়ে দিয়ে দিলাম। বাবার রেখে যাওয়া কিছুটা জমি আর একটা কুঁড়েঘর ছিল, থাকার চিন্তা নেই। বউ কয়েক বাড়ি বাসন মাজার কাজ করে, আমি লজেন্স বেচি, এইকরে দুটো পেট চলে যায়।

এটা ভালো আপনার, একটাই মেয়ে, গরীবদের দেখেছি একগাদা করে ছেলেমেয়ে থাকে।

দমদমের আগে এসে সিগন্যাল না পেয়ে ট্রেন দাড়িয়ে থাকে।

কত করে দাম আপনার লজেন্সের?

টাকায় একটা, পাঁচটাকার নিলে ছ’টা দিই।

লজেন্স ভালো?

‘দেখুন একটা খেয়ে,’ – তারাপদ ভদ্রলোকের দিকে একটা লজেন্স বাড়িয়ে দেয়।

না না , আমি এখন খাবো না।

খান না, দাম দিতে হবে না, আপনি একটা খান আমিও একটা খাই, মনটা বিড়ি খেতে চাইছিলো, ট্রেনে তো আর খাওয়া যাবে না, লজেন্সই খাই।

ট্রেন দমদমে ঢোকে। ভদ্রলোক লজেন্সটা নেয় না বরং বলে, ‘আমি যদি গোটা লজেন্সের প্যাকেটটা নিয়ে নিই আমাকে কতো দিতে হবে?’

তারাপদ এবার চমকে ওঠে। নিজের কানকে বিশ্বাস হয়না।

আসলে আমার ছেলের জন্মদিন কালকে। কেক আর লজেন্সটা আমার কিনে নিয়ে যাবার কথা ছিল, আর আজই এমন রাত হল অফিস থেকে বেরোতে,- আপনার লজেন্স তো ভালোই বলছেন। দিয়ে দিন এক প্যাকেট, কেকটা নাহয় কাল কিনে নেব।

ভদ্রলোক মানিব্যাগ বার করে, ‘বলুন কত দিতে হবে?’

ঘোর কাটাতে একটু সময় নেয় তারাপদ, তারপর লজেন্সের গোটা প্যাকেটটা এগিয়ে দেয়,  ‘আমার সারাদিনের রোজগার লাস্ট ট্রেনেই হয়ে গেলো, আপনাকে আর দাম কি বলব, সবই তো শুনলেন । আপনি একশো পঁচিশ টাকা দিন।’

আমার কিন্তু পাঁচশো টাকার নোট। ভাঙানি নেই।

এইরে, এবার ফাঁপরে পড়ে তারাপদ। ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে দিনের যাবতীয় রোজগারের টাকা বার করে আনে। দোমড়ানো মোচরানো অধিকাংশ দশ টাকার নোট, কোলে রেখে সে টানটান করতে থাকে। গুনে দেখে সবমিলিয়ে সত্তর টাকা। এবার সে বা পকেটে হাত ঢোকায়, মুঠোভরে তুলে আনে যাবতীয় খুচরো, কিন্তু এ আর কত হবে? সে বোঝে সবমিলিয়ে একশো দশ-কুড়ি টাকা আছে তার পকেটে। পাঁচশো টাকার নোটটা হাতে নিয়ে সে উঠে দাড়ায়, ‘আমার কাছে তো হচ্ছেনা দাদা, দাড়ান দেখি কার কাছে খুচরো পাই।’

একটু তারাতাড়ি করবেন, ট্রেন কিন্তু দমদম ছেড়ে দিয়েছে, আমি সামনের স্টেশনেই নামবো।

গেটের সামনেই একজন স্যুট পরা লোক, এরকাছে নিশ্চই পাওয়া যাবে ভেবে তারাপদ এগিয়ে গেল, ‘দাদা একটা পাঁচশোর নোট ভাঙিয়ে দেবেন?’

‘না দাদা হবে না,’ একটু তাচ্ছিল্লের ভঙ্গিতেই বললো লোকটা। একটু দুরেই আরেকজন অফিসফেরত ভদ্রলোক, তারাপদ তারদিকে হাতটা এগিয়ে দিল।

না দাদা পাঁচশো টাকা আমি নিজেই নিই না। আজকাল সবথেকে বেশী জাল হয় পাঁচশোর নোট।

তারাপদ আর কথা না বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায়। কোনায় জানলার ধারে দুজন, দেখলে মনে হয় নতুন বিয়ে হয়েছে, নিভৃত জায়গা বেছে গল্প করতে করতে চলেছে, সম্ভবতঃ নেমন্তন্ন বাড়ি খেয়ে ফিরছে। তারাপদ তাদের কাছে গিয়ে ভেঙে পড়ে, ‘দাদা একটা পাঁচশোটাকা খুচরো করে দিন না, খুব উপকার হয়।’

তারা দুজন নিজেদের মধ্যে গল্পে এতই মশগুল ছিল যে ভদ্রলোক হটাৎ খুব ঘাবড়ে গিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। যেহেতু সাথে একজন মহিলা আছে, ইনি কিছুতেই তারাপদর মতো একজন বয়স্ক মানুষকে ফেরাবেন না, এই আশায় তারাপদ বলতে থাকে, ‘ওই দাদা ছেলের জন্য এক প্যাকেট লজেন্স কিনবেন, আমার সারা দিনের বিক্রি, একটু দেখুন না বোন।’

এবার ভদ্রলোক প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে। ‘কিন্তু আমার কাছে কি হবে…’ বলতে বলতে উনি মানিব্যাগের নোট গুনতে থাকেন। আশায় তারাপদও সেদিকে তাকিয়ে থাকে। ‘…না তো, পাঁচশো টাকার নোট একটা আছে কিন্তু খুচরো তো অত হচ্ছে না। আমার কাছে তিনশো আছে তোমার কাছে কিছু হবে?’ – ভদ্রলোক তার বউকে জিজ্ঞেস করে।

তারাপদও তাল মেলায়, ‘একটু দেখুন না বোন, খুব উপকার হয়, ভগবান আপনাদের মঙ্গল করবেন।’

ভদ্রমহিলা তার হাতব্যাগ খুলে রুমাল, লিপস্টিক, ছোট আয়না ইত্যাদি বহুকিছুর সাথে দু-তিনটে দশ টাকার নোট বার করে। কয়েকটা খুচরো পয়সা, এরবেশী আর কিছু বেরোয় না। ভদ্রমহিলা বলে, ‘এমনিতে তো হচ্ছে না, আমরা যদি আপনার কিছু লজেন্স কিনি তাহলে কি আপনার কোনো লাভ হবে?’

না বোন, হবে না।

‘কই দাদা আপনার হলো?’ ওপাশ থেকে লজেন্সের ক্রেতা হাক দেয়। ‘সি সি আর ব্রিজ তো টপকে যাচ্ছে। না পারলে ছেড়ে দিন, এবার নামবো।’

তারাপদ এবার মরিয়া হয়ে ওঠে। কামরার মধ্যে সে গলার সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করতে থাকে, ‘দাদা কারো কাছে একটা পাঁচশো টাকার নোট ভাঙানি হবে? দাদা প্লিজ, হলে আমার এক প্যাকেট লজেন্স বিক্রি হয়। একটু উপকার করুন না এই গরীব মানুষটাকে।’

তারাপদ কামরার এমাথা থেকে ওমাথা অব্দি পাগলের মতো পায়চারী করতে থাকে। কেউ বিশেষ সারা দেয় না। স্টেশনে ঢোকার আগে ট্রেনের গতি কমতে থাকে। গেটের কাছে একটা লুঙ্গি ছেঁড়া গেঞ্জি পড়া চ্যাংড়া ছেলে, তারাপদ তাকেও জিগেস করে, ‘হবেরে ভাই, পাঁচশো টাকা খুচরো!

সে অবাক হয়ে তারাপদর দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘আপনি আর লোক পেলেন না মশাই! ছেড়ে দিন চলে আসুন। আমার টাকাটা ফেরত দিন।’ লজেন্স ক্রেতা ডাকে তারাপদকে।

আপনার কাছে কোনোভাবেই একশো টাকা হবেনা না? পঁচিশ টাকা নয়তো কাল পরশু কোনো একসময় নিয়ে নিতাম।

‘না দাদা নেই, থাকলে কি আর আপনাকে হয়রানি করাতাম।’ ভদ্রলোক লজেন্সের প্যাকেট ফেরত দিয়ে তারাপদর থেকে পাঁচশো টাকার নোটটা নিয়ে নেন।

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকে। ভদ্রলোক নেমে পড়েন। হতাশ তারাপদও তার সাথে নেমে পড়ে, ‘চলুন প্ল্যাটফর্মে কোনো দোকান থেকে ভাঙিয়ে নিই।’

আপনি পাগল হয়েছেন নাকি মশাই! বরানগর প্ল্যাটফর্মে রাত এগারোটায় দোকান খোলা থাকে!

তাহলে নিচে ডানলপে নিশ্চই দোকান খোলা পাবো, কেউ নিশ্চই ভাঙিয়ে দেবে।

আরে আপনি বাড়ি যেতে পারবেন না তো, ফিরবেন কি করে? এটাই লাস্ট ট্রেন।

তাই তো, খেয়াল হয় তারাপদর। বাড়ী তাকে ফিরতেই হবে, নয়তো তার বৌ  জাস্ট দুশ্চিন্তা করে মারা যাবে। ট্রেন ছেড়ে দেয়। আবার চলন্ত ট্রেনে লাফিয়ে ওঠে সে। যদিও এবার আর হড়কায় না। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে ক্রমশঃ ছোট হয়ে যাচ্ছে তার এক প্যাকেট লজেন্স বিক্রির হটাৎ দেখা স্বপ্ন, অপসৃয়মান একদিনের বিক্রির লাভ।

ঠান্ডা বাতাসের ঝাপ্টা লাগলে চোখে জল আসে। চোখে জল এলে সব দৃশ্যই আসলে ঝাপসা লাগে।

১৯৯৯ (সহনাগরিক)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top