আমি আমার অমিকে

চোখের সামনে পৃথিবীটা অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে গেলো। চিঠিপত্র দিয়ে শুরু হয়েছিল, ধীরে ধীরে শব্দ, ছবি, সিনেমা, লিটল ম্যাগ, খবরের কাগজ, এমনকি আমার সামাজিকতাও। আজ আমি অনেকটাই ডিজিটাল-সামাজিক।

নতুন বই পড়ার মধ্যে যেমন নতুন গল্প পড়ার আনন্দ থাকে, তেমনি নতুন বইয়ের ঘ্রানে একটা নেশাও থাকে। সে অভ্যেস অপসৃয়মান। এখন ডিজিটাল গল্প পড়ার যুগ। ফেসবুকে অসংখ্য মানুষ এখন নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেন। তারা যে এতো ভালো লেখালেখি করতেন, এই ডিজিটাল প্লাটফর্ম না হলে আমার হয়তো জানা হতো না। নতুন লেখা পড়তে চাওয়ার আগ্রহ আমার চিরকালীন। কিছুদিন আগে তেমনই একটা গল্প পড়ি, ‘বিষাদের অশ্রুজলে’। গল্পের নায়ক অনুপম সকালে উঠে হটাৎ জানতে পারে, পাড়ায় সুধা-জেঠিমা মারা গেছেন। অনুপম যদিও শেষ সময়ে শবযাত্রায় পাশে থাকতে চেয়েছিলো (অর্থাৎ সামাজিক হতে চেয়েছিলো) কিন্তু কাজের চাপে আর সেটা হয়ে ওঠা হলো না।

আমার মনে হলো, এটা কেবল গল্প নয়, এই সময়ের একটা অন্যতম বৈশিষ্ট। আমরা কজন জানি আমার পাশের বাড়িতে কি হচ্ছে? কাগজে হামেশাই পড়ি একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা ফ্ল্যাটে মরে পচে গলে রয়েছেন।  চারদিন পরে গন্ধ পেয়ে তথাকথিত প্রতিবেশী পুলিশে খবর দেন। হটাৎ শুনি সুমিতদার বৌ গত একবছর ধরে আর সুমিতের সাথে থাকতো না।  যেদিন ডিভোর্স হয়ে ঐশী সব পাওনাগণ্ডা এমনকি ছেলেটাকে নিয়ে চলে গেলো, সেদিন জানলাম। আমি জানিই না পাড়ায় অমল কত সুন্দর আবৃত্তি করে, বিমল এ ডিভিশনে ফুটবল খেলে, কমল অক্সফোর্ডে পি.এইচ ডি করতে চলে যাবে আগামী শুক্রবার। অথচ আমার ছোটবেলায় এই সব বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো রোজ বিকেলে মাঠে জড়ো হতাম, খেলতাম, সবাই সবাইকে চিনতাম, জানতাম, পিকনিক হতো, একসাথে দোল খেলা হতো, ঘুড়ি ওড়াতাম। এমনকি সেসময় প্রত্যেক পাড়ায় এক বা একাধিক কাকিমা মাসিমা থাকতো যে বাড়ি ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করতো আর অন্যকে বলে বেড়াতো, আমরা বলতাম পাড়ার গেজেট। প্রতি পাড়ায় একজন দুজন বেকার ছেলে ঠিক থাকতো যে মৃত ব্যক্তিকে একটা কাঁধ দিতো, অন্নপ্রাশন, বিয়ে, উপনয়নের যাবতীয় কাজকর্ম একা তুলে দিতো। সেই সোশ্যাল স্পেসটা আজ আর নেই, অন্তত যেকোনো শহর ও তার শহরতলিতে, আজ আর খুঁজে পাইনা।

Social space is produced by societies. Social space is also a metaphor for the very experience of social life

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, যখন যৌথ পরিবার ভেঙে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি শুরু হচ্ছে, ছোট পরিবার সুখী পরিবার -এই বিশ্বাস নিয়ে মানুষ ক্রমশ স্বার্থপর হয়ে উঠছে, একটা সামাজিক অবস্থান (পারিবারিক স্পেস) ভাঙতে শুরু হলো। ৭০-৮০ র দশকগুলোতে আমার জেঠা এক জায়গায় থাকতো, কাকা অন্য জায়গায় থাকতো, আমরা (আমি বাবা মা) আরেক জায়গায় থাকতাম। বছরে দু-একবার বা কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হতো তুতো ভাই-বোনদের সাথে। তখন বেশি করে পেলাম একটা অন্য স্পেস, পাড়া।

At certain point of time in life, we also prefer to disengage ourselves from our extended family members gradually, as it minimizes social restrictions and offers more liberal space until we make our own family.

কিন্তু আমাদের বড়ো হয়ে ওঠার সেই সোশ্যাল স্পেসটা (পাড়া ) একবিংশ শতাব্দীতে এসে হারিয়ে গেলো। যদিও আমার মনে হয় এই স্পেসটা কিন্তু যাবারই ছিল, কারণ এই স্পেস-এ কিন্তু কোনো আত্মীয় ছিল না।

বদলে পেলাম আরেকটা নতুন স্পেস। আজ আমি জানিনা আমার পাশের বাড়িতে কবে মাংস রান্না হয়েছে। (একসময় জানতাম শুধু তাই না, এবাড়ি-ওবাড়ি মাংসর বাটি চালাচালি হতো) কিন্তু এটা জানি, কিছুদিন আগে আমার ফেসবুক বন্ধু সোমাদির বাড়িতে লোকজন এসেছিলো, সোমাদি মাংস রেঁধেছেন, সেটা অনেক বেশি হয়েছে, তিনি আরেক ফেসবুক বন্ধু সৌমিককে ডেকে খাইয়েছেন, সৌমিক সেটি তার ছেলে টিটোবাবুর জন্য বাড়ি নিয়ে গেছে। ভেবে দেখুন, কোথায় সোমাদি, কোথায় সৌমিক, কোথায় আমি? কোথায় আমার সেই তাইওয়ানের বান্ধবী, যে জানে আমি পেটুক, নতুন কিছু রান্না করলেই তার ছবি আর রেসিপি আমায় পোস্ট করে। 

A virtual space is unreal, an unreal space is uncertain, an uncertain space is unstable.

যদিও এই নতুন স্পেসে একটা মজা আছে।  এখানে অন্য সব স্পেসের পছন্দের মানুষগুলোকে জড়ো করে ফেলতে পারলাম। দূরে চলে যাওয়া পরিবার, ছেড়ে রেখে আসা বন্ধুবান্ধব, অফিস কলিগ, নিত্যসহযাত্রীর পাশাপাশি স্ত্রী এবং গোপন পরকীয়ার অনায়াস সহাবস্থান। এখন আমার সোশ্যাল স্পেস আর ভৌগোলিক সীমায় নিয়ন্ত্রিত নয়। এই স্পেস-এ আমি জানি আমার কোন বন্ধু আজ বিদেশ গেলো, কোন বন্ধুর মেয়ের জন্মদিন, কে অ্যাওয়ার্ড পেলো, এমনকি এই স্পেসেই প্রথম জানলাম পাশের বাড়ির ছেলেটি দারুন কবিতা লেখে যা দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়। এই স্পেস-এ কেউ আমাকে প্রতিদিন সকালে শুভেচ্ছা পাঠান, কেউ তার খালি গলার একটুকরো গান পাঠায় নিয়মিত। আমি ক্রমশ অ্যাডিক্টেড হয়ে যাই। কারণ এই স্পেসটা আমার তৈরী, আমার নিয়ন্ত্রিত।  সোশ্যাল স্পেস আর সেটা নয় যেটা সোসাইটি আমাকে অফার করে, বরং সোশ্যাল স্পেস এখন সেটা যা আমি চাই, আমি চাইলে অপছন্দের  লোকটাকে বার করে দিই।  আমার স্পেস আমি নির্মাণ করি। 

আর ঠিক তখন এই স্পেসও আমাকে নির্মাণ করে। 

আমি (SELF) কে? কিভাবে চেনে এই নতুন বন্ধুরা আমাকে? কতটুকু জানে আমায়? একপাতা লিখতে পারবে বড়জোড়, দুপাতা। সেটা আসল ‘আমি’র কত শতাংশ? ভগ্নাংশ মাত্র। তবু তারা আমাকে কত সুখ দুঃখ হাসি কান্না বিরহ মিলনের কত মুহূর্ত শেয়ার করে। কখনো কখনো আমি রিঅ্যাক্ট করি, আর সেই মুহূর্তে তারা আমাকে একভাবে নির্মাণ করে। এরকম অসংখ্যজনের আমি জুড়ে জুড়ে প্রতিদিন একটা আমি (self) তৈরী হয়। ভাঙে, আবার তৈরী হয়। মজা হলো, এই সবকটা আমিই সত্যি। তাই অসংখ্য আমির মধ্যে চলতে থাকে এক নিরন্তর সংঘাত।

There is a continuous conflict between the ‘SELF’ and the ‘self’ constructed by the social space which is again constructed by the SELF. This virtual space expands day by day; the more it moves towards infinity it becomes more unreal. The ‘insecurity of SELF’ is directly proportionate with this ‘unreal space’. And the identity crisis of SELF begins.

ছোটবেলায় যে বন্ধুটি আমাকে হিংসে করতো, পরীক্ষায় কিভাবে টপকানো যাবে সেই কম্পিটিশন করতো, সে আজ আমায় জন্মদিনে শুভেচ্ছা পাঠায়।  এই স্পেস এ একটা নতুন আমি তৈরী হয়। আমার যে বান্ধবীর সাথে কথা ছিল হেঁটে যাবো ছায়াপথ, তারপর একদিন বেলঘরিয়া স্টেশনের পেছনের গলিটাতে শেষবারের মতো বুকে মাথা রেখে চোখের জল ফেলে বলেছিলো, – এজন্মে হলোনা…., সে এখন আমার ফেসবুকে, সুখের খবরে লাইক দেয়, দুঃখের খবরে সমব্যাথী।  আবার একটা আমি জন্ম নেয়।  একটা আমি স্মৃতির পাতা খুলে, পুরোনো অ্যালবাম ঘেঁটে আরেকটা আমিকে খোঁজার চেষ্টা করে, যাকে সে বারো বছর আগে এক আদ্র সন্ধ্যায় নিঝুম গলিতে ছেড়ে এসেছিলো।

আমার পুনর্নির্মাণ শুরু হয়।

২০১৮ (শারদীয়া মনকথা)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top