একটি অরাজনৈতিক প্রতিবেদন

এবছর আমার ভোট দেওয়া হলোনা। জানি, ভোট দেওয়া আমার অধিকার, নৈতিক দ্বায়িত্বও, যাইহোক না দেওয়াও আমার অধিকারের মধ্যে পরে। আসলে ভোট দেবার কোনো আগ্রহ পেলামনা। ভাবছিলাম কাকে দেব? আমার কাছে যে সব প্রার্থীর অপশন রয়েছে, তার একজন ঘুষ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত, একজন যৌন হয়রানি তে অভিযুক্ত, একজন জেলফেরত। এদের থেকে আমায় বাছতে হতো আমি কাকে পছন্দ করি।  আমি এদের কাউকে পছন্দ করিনা। এমনকি আমি কোনো বিনোদন জগতের মানুষকেও পছন্দ করিনা ভোটপ্রাপ্রার্থী হিসেবে। আমি মনে করি সেই মানুষটারই প্রার্থী হওয়া উচিত যে সচেতন ভাবে সর্বক্ষণের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজকর্মের সাথে যুক্ত এবং দেশের উন্নতি নিয়ে যিনি অন্তত একটি নতুন ভাবনা ভাবতে পারেন। এমন মানুষকে ভোট দেওয়ার সুযোগ আমার ছিলোনা। বন্ধুরা বললে, তাহলে নোটা তে দাও, ভোট নষ্ট করবে কেন? কিন্তু সেও ভোট নষ্টেরই সামিল। নোটার মোট ভোট যেকোনো প্রার্থীর মোট প্রাপ্ত ভোটের থেকে বেশি হলেও সেটা গণ্য হয়না। আমার মতামত যেখানে গণ্যই হয়না, সেখানে এই গরমে দুপুর রোদে একঘন্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে ভোট কেন দেব ভেবে পেলামনা।

ভোটের আগে কয়েকমাস যাবৎ প্রচার-পর্বটা নিয়েও আমার আপত্তি ছিল। একটা দলও বললোনা, আমি জিতে এলে এমন শিক্ষা ব্যবস্থা করবো যে প্রতিটি শিশু প্রায় নিখরচায় শিক্ষা পাবে। এমন একটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলবো যেখানে প্রতিটা সাধারণ মানুষ স্বল্প খরচে পরিষেবা পাবে। কেউ বলেনি। ‘বছরে এতো কোটি বেকারের চাকরি হবে’ তো একটা গিমিক। কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখেনা। এই মুহূর্তে দূষণ একটা কঠিন সমস্যা। পৃথিবীর সবথেকে দূষিত শহরগুলির মধ্যে আমাদের বেশ কয়েকটি শহর। অথচ, কেউ বললো না, আমি বা আমার দল এলে দূষণ শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করবো। প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করবো, এমন গাড়ি চলতে দেবোনা যা বাতাসে দূষণ ছড়ায়। কেউ বলেনি। আমাদের প্রতিদিনের খাবারের গুণমান কেউ নিশ্চিত করলোনা। মাছে ফরমালিন, শাক সবজি রঙে চোবানো, প্রসেসড খাবারে প্রিসারভেটিভ দেওয়া, হোটেলে ভাগাড়ের মাংস, দুধে নাকি শ্যাম্পু মেশায়… টাকা দিলেও আজ আর এমন জিনিস পাওয়া যায় না যা নিশ্চিন্তে নিজের সন্তানকে খাওয়াতে পারি। অথচ একজন ও কেউ বললো না, ভোটে আমি জিতে এলে এ সব বন্ধ করবো। কেউ এটুকুও নিশ্চিত করে বলেনি যে আগামী পাঁচ বছর অন্তত আমার এলাকায় আপনার সুরক্ষা নিশ্চিত, একটাও গুন্ডাগিরি হবে না, একটাও তোলাবাজ থাকবেনা, একটাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে না, কথা দিলাম।  বিগত কয়েকদিন যিনি আমার দরজায় করজোড়ে ভোটপ্রার্থী, কাল জেতার পর আর আমি চট করে তার কাছে পৌঁছতে পারবো না।  জেড ক্যাটেগরির যে নিরাপত্তা মন্ত্রীকে সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা করে দেয়, তিনি কিভাবে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবেন আমি জানিনা।

ভোটের দিন এমনিতে বেশ মজা, ছুটি পাওয়া যায়। রাস্তায় গাড়ি কম থাকে, তাছাড়া গোলমালের আশঙ্কায় কোথাও যাওয়াও যায়না। কাজেই দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে ঘুম দেওয়া ছাড়া প্রায় কিছু করার নেই। তো এবছর বিছানায় আধশোয়া হয়ে পায়ের নখ খুঁটতে খুঁটতে হটাৎ একটা গল্পের প্লট মাথায় এসে গেলো:

এক প্রত্যন্ত দরিদ্র গ্রামের এক নিঃসন্তান দম্পতি নিজেদের সামাজিক কাজে মগ্ন ছিল। এমনিতেই গ্রামটি রুক্ষ, চাষ আবাদ নেই, চরম দারিদ্র, উন্নতির ছিটে ফোটাও নেই। লোকটি একটা স্কুল খোলে, গ্রামের সব শিশুরা পড়তে আসে। ওনার স্ত্রী গ্রামের মহিলাদের সংগঠিত করে বিভিন্ন জিনিস তৈরী করে, বিক্রি করে। পরিবারগুলো আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ায়। পুরুষেরা একত্রিত হয়ে গ্রাম কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছবির মতো করে তোলে। যদিও কোনো প্রথাগত সংগঠন তারা করেনা। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পরে আশেপাশের গ্রামে। নিজেরাই রাস্তা বানায়, নিজেরাই স্বাস্থকেন্দ্র পরিচর্চা করে।  স্কুলের ছাত্র সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। এরপর তা নেতাদের গোচরে আসে।  তারা লোকটিকে পুরস্কার দেয়, তার এলাকার উন্নয়ন বলে দাবি করে। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্থসাহায্য করতে এগিয়ে আসে। যদিও সে টাকা কোথায় যায় কেউ জানে না।  কিন্তু ভোটার সময় সব নেতারাই লোকটিকে সামনে রেখে লড়তে চায়।  এভাবে দিব্বি চলতে থাকে।

সেবছর লোকটি, হয়তো আমারই মতো কনফিউসড ছিল, ঠিক করে, নাহ, আর আমাকে ভাঙিয়ে কাউকে ভোট জিততে দেব না। আমি নিজেই ভোটে লড়বো, এবং কোনো রাজনৈতিক দলের টিকিটে নয়, স্বাধীনভাবে। এবার শুরু হয় সংঘাত। বাড়িতে আক্রমণ, স্কুলে আগুন, স্ত্রীকে অপবাদ, পুলিশি হেনস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি চলতে থাকে। তার গ্রামের অনেক প্রিয় মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যদিও আবার কিছু মানুষের সমর্থন ও সে পায়। এভাবেই ভোটপর্ব সমাধা হয় এবং গল্পের নিয়ম মেনে সে জিতেও যায়।

(এই অব্দি পড়ে যারা একটা বস্তাপচা ফিল্মি গল্পের গন্ধ পাচ্ছেন তাদের জন্য আমি আরেকটু ভেবে রেখেছি) ফল প্রকাশের পর দেশে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরী হয় । শাসক দল ও তার সহযোগীরা যতগুলি আসন পেয়েছেন, বিরোধী দল ও তার সহযোগীরাও ঠিক ততগুলি আসন পায়। বাকি আছে একটি মাত্র আসন, একজন মাত্র নির্দল প্রার্থী, আমার গল্পের সেই লোকটি। গোটা দেশ তার দিকে তাকিয়ে, সে যেদিকে যাবে, সেইদল দেশ শাসন করবেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাবড় তাবড় সমস্ত নেতারা তার বাড়ির সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন। কেউ ব্যক্তিগত জেট পাঠাচ্ছেন তাকে রাজধানীকে নিয়ে আসার জন্য। সামনে অসংখ্য টাকার হাতছনি। কিন্তু মুশকিল হলো, গল্পের নায়ক তো, সে সবকিছুকে উপেক্ষা করে, কাউকেই সমর্থন করে না। রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে বলে, যদি অন্য দল তাকে সমর্থন করে সে নিজেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে পারে… ইয়ে, মানে সেদিন এই অব্দিই ভাবতে পেরেছিলাম। গল্পের নাম দেব ভেবেছিলাম ‘দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রাইমিনস্টার’।

২০১৯ (মনকথা ওয়েব)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top