অপ্রয়োজনীয় শব্দগুচ্ছ

ভুলু কে দেখলে যিশুর খুব হিংসে হয় । ভুলু, যে কিনা কখনো ইস্কুলে যায়নি, একদিনও মাস্টারের বকা খেতে হয়নি, নিল-ডাউন হতে হয়নি, রাত জেগে বিশ্রী ইতিহাস বই মুখস্থ করতে হয়নি, পরীক্ষায় ফেল করে বাবার কানমলা খেতে হয়নি, সে, মাত্র একটা শব্দ ‘ঘেউ’ বলেই সব কাজ হাসিল করে ফেলে । চোরকে ভয় দেখাতে পারে, যিশুর মায়ের কাছে খাবার চাইতে পারে, পুপুর আদর খেতে পারে, আবার পাশের গলির মাদী কুকুরটার সাথে চুটিয়ে প্রেম করতে পারে । আর যিশু, জীবনের মূল্যবান প্রথম তেইশটা বছর ধরে গুচ্ছ গুচ্ছ থিওরি পড়ে, বন্ধ ক্লাশঘরে গন্ধ ব্যাঙ কেটে, সম্পাদ্য উপপাদ্য ঘেঁটে, রবীন্দ্র রচনাবলী থেকে এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার সমস্ত ভল্যুম হাতরে একটা যুতসই শব্দ খুঁজে পায়না যেটা বললে সরকার একটা চাকরি দেবে আর পুপু রাজি হয়ে যাবে তাকে বিয়ে করতে ।

চিলেকোঠার ঘরে, স্তুপীকৃত বই-এর মধ্যে বসে মাইনাস থ্রি পাওয়ারের চশমা ঠেলে ঠেলে যিশু সারাদিন ধরে শব্দ খোঁজে,- একটা শব্দ ।

এর প্রায় দুশো বছর পরে, ফ্রান্সে, বিখ্যাত দার্শনিক তথা ভাষাবিদ টেকো একটা নতুন শব্দ খুঁজে পান । এমনিতে তখন পৃথিবীতে শব্দের ব্যবহার আর নেই । ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে মানুষ যেকোনো ভাষা নির্বিশেষে অন্যের কথা বুঝতে পারে, মন থেকে মনে যায় কথা । কিছু হাতে গোনা উপজাতি, যাদের বুদ্ধিমান মানুষ সব টেকনোলোজি ব্যবহার করতে না দিয়ে এখনো দলিত করে রেখেছে, ছাড়া পৃথিবীতে কেউ আর কারো সাথে শব্দ বিনিময় করে না । এমন সময় টেকো-র নতুন শব্দ ধরাধামে বিপুল আলোড়ন ফেলে । তার সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া উচিত কিনা এ নিয়ে প্রভুত বিতর্ক হলো । স্থির হলো টেকো-র নিজেকেই প্রমান করতে হবে যে এটি তার মৌলিক সৃষ্টি, আজকের দিনেও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ আছে, এবং শব্দটি পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো ছিলো না ।

টেকো পরলো মহা সমস্যায় । দুশো বছর আগে হলে নাহয় একটা কথা ছিলো, তখন স্যোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আইডিয়াটা ছেড়ে দেওয়া যেত, মুহুর্তে লক্ষ কোটি ফিডব্যাক চলে আসতো । কিন্তু এখন তো অরকুট ফেসবুক হোয়াস্ অ্যাপ আর নেই, স্যোশাল নেটওয়ার্কিং জিনিসটাই আর এক্সিস্ট করে না, গোটা পৃথিবী এখন একটাই স্যোসাইটি । ওয়ার্লড ওয়াইড ওয়েব উঠে গিয়ে এখন ওয়ার্লড ওয়াইড হিউম্যান হয়ে গেছে, জন্মের পর মানুষের মাথায় একটা চিপ ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যা স্যাটেলাইট লিঙ্ক করা থাকে । ব্যাস, তারপর সে সারা দুনিয়ার সাথে অনায়াসে যোগাযোগ রাখতে পারে, সব তথ্য তার কাছে । কিন্তু টেকো কি করে প্রমান করবে যে তার শব্দ এই মেমরি-চিপের দুনিয়ার আগে কখনো ছিলনা ।

হতাশ টেকো সারাদিন এতো বিমর্ষ হয়ে বসে থাকে যে বান্ধবীকে ঠিকঠাক আদর পর্যন্ত করতে পারে না । এতে নিলি, তার বান্ধবী, যথেষ্ট বিরক্ত হয় এবং যেহেতু টেকো তার রিসার্চ গাইড, দুম করে ছাড়া যাবে না, তাই সে সহপাঠীর সাথে এক্সট্রা প্রিম্যারিটাল সম্পর্কের মনঃস্থির করে ।

বান্ধবীর এহেন আচরনে টেকো দুঃখ পায় । অনোন্যপায় টেকো প্রভূ যিশুর শরণ করে, অমনি মুহুর্তে যিশু সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তার সামনে খুলে যায় । টেকনোলোজি ব্যবহারের এ এক বিরম্বনা, যদিও ইচ্ছে করলেই মেমরি ফাকা করে দেওয়া যায় এবং বিরক্ত টেকো সেটাই করতে যাচ্ছিলো, এমন সময় হটাৎ দুশো বছর আগে কলকাতায় যিশুর সেই শব্দের খোজ করার খবর তার ‘দিমাক কি বাত্তি’ জ্বেলে দিল । সে ঠিক করলো টাইম মেশিন চেপে দুশো বছর আগে যাবে এবং যিশুকে তার শব্দ শোনাবে । যেহেতু যিশু পুপুর জন্য প্রচুর শব্দ খুঁজেছে, সে নিশ্চই বলতে পারবে শব্দটির আদৌ কোনো ইতিহাস আছে কি না!

কোন এক যৌন মুহুর্তে গদগদ হয়ে টেকো তার গোপন প্ল্যান নিলিকে বলে ফেলে । কিন্তু যেহেতু মেয়েরা চিরকাল সন্দেহবাতিক তাই, তৎক্ষণাৎ নিলি পুপুর সব তথ্য আর ছবি ডাউনলোড করে, অতো সুন্দরী পুপুকে দেখে যেকোনো মেয়ের মতোই ঈর্ষান্বিত হয়, এবং টেকো যাতে কিছুতেই পুপুকে দেখতে না পায় সেই চক্রান্ত কষে ।

টেকো ঘুমিয়ে পরলে, নিলি নিজে আগে টাইমমেশিনে চেপে দুশো বছর আগে পুপুর পাড়ায় যায় । লুকিয়ে তার বাড়ি ঢোকে । পুপু তখন চান করছিলো, ঘর ফাঁকা, নিলি এটা-ওটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে পুপুর পড়ার টেবিলের ওপর মেলা থেকে কেনা একটা প্যাঁকপ্যাঁকে খেলনা হাঁস পায় । এমন মজার খেলনা সহপাঠীকে দিলে সে হেব্বি খুশি হবে, এই ভেবে নিলি সেটা চুরি করে । এমন সময় টেকোর হটাৎ ঘুম ভেঙে যায়, নিলি যদি ধরা পরে যায় সেই ভয়ে ফুরুৎ করে পালিয়ে আসে । ঘুমভাঙা চোখে টেকো যেই হিসি করতে যায় অমনি নিলি পোষাক ছেড়ে চাদরের তলায় ঢুকে পরে । অবশ্য তার আগে, প্ল্যানমাফিক, টাইমমেশিনে একটা যান্ত্রিক গোলমাল করে দেয় ।

নগ্ন নিলি, তার পিঠের ওপর আলুলায়িত কেশরাশি, ঘরের জানলা দিয়ে চুঁইয়ে আসা মায়াবী আলোয় ঘেরা পীনোন্নত স্তন, ‘মোহমুদ্গরের মতো পাছা’, টেকোকে কামুক করে তোলে । কিন্তু উত্তেজিত টেকো বালিশের নিচ, পাজামার পকেট, আলমারীর লকার হাতরে কোথাও একটা কন্ডোম খুঁজে পায়না । হতোদ্যম হয়ে সে নিলির জামার পকেটে হাত ঢোকায় আর সেই প্যাঁকপ্যাঁকে খেলনা হাঁস হাতে পায় । হাসটাকে সে হস্তগত করে এইভেবে, যে যদি যিশু কিছুতেই তার কথা বুঝতে না পারে, অন্তত কিছুভাবে তো কমিউনিকেট করতে হবে ।  

টেকো যথাসময়ে পশ্চাদগমন করে করে কিন্তু টাইমমেশিন নিলির প্ল্যানমাফিক একশো সত্তর বছরে গিয়ে থেমে যায় । কিছুতেই আর এগোয় না । অগত্যা টেকো যে যিশুকে পায় বয়স তার একান্ন,  কনস্টিপেশন তদুপরি পাইলস্ হেতু খিটখিটে মেজাজ, থলে হাতে বাজারমুখী । অসময়ে সামনে এক লালমুখো সাহেব দেখে যিশু যারপরনাই বিরক্ত । এমন অবস্থার জন্য টেকোও প্রস্তুত ছিলো না । এমনিতে তার কথা বলার অভ্যেস নেই, যিশুর জন্য সে স্ক্রিপ্ট বানিয়ে নিয়ে এসেছিলো, কিন্তু অবস্থার চাপে পরে সেটাও ঘেঁটে ঘ ।

_)(*ৎঃ%৳#ঁ!~

কি?

~!ঁ#৳%ঃৎ*()_

দূর মশাই ! কি বলছেন কি? বাংলা তো জানেন না বুঝলাম, ইংরাজী তো বলুন !

ঃৎ*%৳#)_!(

আরে এতো মহা গেড়ো । আমি কিছুই বুঝছিনা মশাই, পথ ছাড়ুন !

যিশু পাশ কাটিয়ে যেতে চায় । টেকো পরেছে মহা ফ্যাসাদে, অথছ নাছোড়বান্দা, পথ ছাড়েনা । সে এবার আকার ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করে ।

রেললাইন ? আছে তো ! এই রাস্তা ধরে সোজা চলে যান ।

(আকার ইঙ্গিত) + ৳%ঃৎ*!~

হ্যাঁ হ্যাঁ রেললাইন, বুঝতে পেরেছি, আমি ওদিকে যাবোনা মশাই, আপনি সোজা চলে যান দেখতে পাবেন ।

(আকার ইঙ্গিত) + ৳%ঃৎ*!~

রেললাইনের ওপাড়ে ? হ্যাঁ একটা বসতি আছে । কাউকে খুঁজছেন ?

(আকার ইঙ্গিত) + ৳%ঃৎ*!~

আরে নামটাতো বলুন । আমি এখানে পঞ্চাশ বছর ধরে আছি, সবাইকে আমি চিনি ।

(আকার ইঙ্গিত) + ৳%ঃৎ*!~

‘একজন মহিলা ! খুব সুন্দরী ?’ যীশু মনে মনে ভাবে, ‘পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরী মেয়ে ওপাড়ায় থাকতো । সে আমাকে একদিন ভালোবেসেছিলো । সে চলে যাবার পর ওপাড়ায় আমি আর কখনো যাইনা ।’

টেকো এবার তার হাত ধরে টানাটানি করে ।

না মশাই ওদিকে আমি যাবো না । আমার ব্যক্তিগত অসুবিধা আছে । আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, আপনি সোজা চলে যান ।

হটাৎ টেকোর মনে পরে তার পকেটে থাকা প্যাঁকপ্যাঁকে হাঁসটার কথা । অমনি সে বার করে যিশুকে দেখায় ।

‘আরে এই হাঁসটা আপনি কোথায় পেলেন ? এটা তো তিরিশ বছর আগে একটা মেলায় আমি আর পুপু কিনেছিলাম । একটা ও আমায় কিনে দিয়েছিলো, একটা আমি ওকে ।’ কিন্তু এই সাহেব কিকরে হাঁসটা পেল ? ওপাড়া, সুন্দরী মেয়ে, তবে কি পুপু ….

টেকো হাঁসটাতে দম দেয় আর সেটা প্যাঁকপ্যাঁক করতে থাকে । যিশু টেকোর দুহাত ধরে নিতাই চাটুজ্যের রোয়াকে ধপাস করে বসে পড়ে ।

বাহ্ ! আপনারটা এখনো চলে ? আমারটা অনেকদিন হলো বন্ধ হয়ে গেছে ।

২০১৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top