শতবর্ষে অরোরা

প্রাককথন

অরোরা স্টুডিও নিয়ে প্রথম তথ্যানুসন্ধানের কাজ শুরু করেছিলাম একটি  বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের হয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের সময়। সেটি ছিল মূলত ইন্টারভিউ এবং অরোরা প্রযোজিত চলচ্চিত্রের খণ্ডদৃশ্য সহযোগে নির্মিত, এবং খুব তথ্যসমৃদ্ধ না হলেও, অরোরাকে নিয়ে আমার যাবতীয় আগ্রহের শুরু। কিছুদিন পরে, স্নাতোকোত্তর স্তরে চলচ্চিত্র বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার সময়, গবেষণাপত্র প্রস্তুতির জন্য অরোরা’ কে বেছেছিলাম বিষয় হিসাবে। চেষ্টা করেছিলাম ‘অরোরা’কে, বাংলা সিনেমার ইতিহাসের প্রেক্ষিতে পড়ে দেখার। বাংলা চলচ্চিত্রের সমগ্র সময় ধরে যে প্রতিষ্ঠানের নিরবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি, ১০০ বছরের সুদীর্ঘ যাত্রাপথে, বহু দুর্লভ ঘটনার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ সেই অরোরাকে নিয়ে তৈরি প্রবন্ধ এরপর প্রকাশিত হয় ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার শারদীয় ২০০১ সংখ্যায়। নির্বাক যুগ এবং সবাক যুগের প্রথম পর্যায় বা স্টুডিও যুগ এবং অরোরার ভূমিকা ধরা ছিল সেই প্রবন্ধে। ১৯৫০ পরবর্তী সময়ে অরোরার বাংলা কাহিনিচিত্রের নির্মাণ ও পরিবেশনার বিষয় খুব বেশি ধরা যায়নি সেই রচনায়। ‘অরোরা’ নিয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ হয় ‘SARAI’, Centre for the Study of Developing Societies-এর আর্থিক সহায়তায়। এই গবেষণাপত্রে অরোরাকে পড়তে চেয়েছিলাম বিভিন্ন আঙ্গিকে –

(১) চলচ্চিত্রের ইতিহাসের গতিপরিবর্তনের সাথে সাথে নিত্যনতুন ভাবনা চিন্তা

(২) বিভিন্ন ব্যবসায়িক পরীক্ষা-নিরীক্ষা

(৩) বাংলা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চিরন্তন বোধকে বহন করে চলা এবং বিভিন্ন শিল্প সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার নিরন্তর প্রচেষ্টা

এবং

(৪) সর্বোপরি, চলচিত্রের মূলধারার পাশাপাশি একটা সমান্তরাল অস্তিত্ব খোঁজার প্রয়াস।

এটিই সম্ভবত একমাত্র চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান যা একই পারিবারিক মালিকানায়, কোনো হাতবদল ছাড়াই, একশো বছর ধরে সক্রিয়। স্বাভাবিকভাবেই বহু গল্প ছড়িয়ে আছে এখানে চারপাশে। বহু বিখ্যাত ছবির সেট পড়েছিল এই স্টুডিও ফ্লোরেই। ঋত্ত্বিক ঘটক প্রথম জীবনে কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন এদের সাথে। বিহারের ওপর দুটো তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছিলেন তিনি অরোরার হয়ে। সুভাষ চন্দ্র বোসের যে বক্তৃতাটি আমরা মাঝেমধ্যে দেখেছি টেলিভিশনে, এখানে এসেই রেকর্ড করেছিলেন সুভাষ বসু। বিবেকানন্দ সেন্টেনারীতে বক্তৃতা রেকর্ড করার জন্য ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন এসেছিলেন এখানে। মজফ্রপুরে একবার ভূমিকম্পের সময়, অরোরা একটা গোটা প্লেন ভাড়া করে গেছিল শুটিং করতে। এইরকম বহু অজানা গল্প, তথ্য আর বিস্মৃতির ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে অরোরায়।

বর্তমান প্রবন্ধে এই বিষয়গুলি ছুঁতে চেয়েছি যতটা সম্ভব। অধিকাংশ তথ্য ‘অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন’-এর অফিসে রাখা ফাইল, চিঠি-পত্র পড়ে সংগৃহীত। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা এবং সংবাদপত্র থেকেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৩০ সালের আগের কোনো তথ্যই আর পাওয়া যায় না। পরবর্তী যেসব চিঠিপত্র পাওয়া যায়, তা-ও জীর্ণ, উই-ধরা আর বহু স্থানান্তরের ফলে অর্ধলুপ্ত, অসম্পূর্ণ। শুণ্যস্থান পূরণের জন্য তাই নির্ভর করতে হয়েছে অরোরার সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের স্মৃতিচারণকে।

তাই এই প্রবন্ধে ‘অরোরা’র পাঠ কখনোহ সম্পূর্ণ হয় না। এটি ‘অরোরা’ প্রসঙ্গে একটা সম্পূর্ণ ধারণা করার প্রচেষ্টা মাত্র।

সিনেমার আদিযুগ এবং অরোরা

২০ জানুয়ারি, ১৮৯৭ সাল। ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তের কিছু সংখ্যক মানুষজন চলচ্চিত্রের প্রথম প্রদর্শন দেখল কলকাতার ‘রয়্যাল থিয়েটারে’। এরপর ক্রমশ মিনার্ভা থিয়েটার, ক্লাসিক থিয়েটার, স্টার থিয়েটারে নাটকের মাঝখানে বা শেষে শুরু হয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন। মূলত কয়েকজন ইউরোপিয় ব্যক্তিত্বের তৎপরতায় কলকাতায় বিচ্ছিন্নভাবে সিনেমার প্রদর্শন শুরু হলে, ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন তৈরি করেছিলেন ‘রয়েল বায়োস্কোপ’। ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চিত্রপ্রদর্শন শুরু করলেন। এর অনতিকালের মধ্যেই এসে পড়ল ‘ম্যাডান’রা। তাদের ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ’ চলচ্চিত্রের ব্যাবসাকে সাফল্যের চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছে দিল। কিন্তু এদের উভয়েরই প্রদর্শনীগুলি ছিল মূলত কলকাতাভিত্তিক। চলচ্চিত্রের এই বাণিজ্যিক সাফল্যে উদ্দীপ্ত হয়ে আরো যে-সমস্ত ব্যক্তি তাদের বায়োস্কোপ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা বুঝলেন, কেবলমাত্র কলকাতার নির্দিষ্ট দর্শক দিয়ে একটা ব্যাবসাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এর বাজারের ব্যাপ্তির প্রয়োজন। কিছুটা কলকাতার বাজারের প্রতিযোগিতা এড়াতে, এবং কিছুটা নতুন বাজার দখলের তাগিদে এরা ছবি নিয়ে চলে গেলেন প্রত্যন্ত গ্রামে। এরা হলেন ভ্রাম্যমান প্রদর্শকের দল। চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার এবং প্রসারের এরাই ছিলেন মূল কাণ্ডারী। এই সমস্ত প্রদর্শকরা একসঙ্গে তিন-চারটে অনুষ্ঠান এবং ছবি নিয়ে ঘুরতেন। অধিকাংশই পুরোনো, জীর্ণ, ফলে খুব সস্তায় কেনা হাস্যকৌতুক, অপেরা, ভ্রমণ সংক্রান্ত, ক্রিড়া সংক্রান্ত ১০০-২০০ ফিটের খণ্ডচিত্র, কার্বন-জেট বার্নারের প্রোজেকশন যন্ত্র, তাঁবু, আসবাব, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি গোরুর গাড়িতে বহন করে এঁরা একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যেতেন মেলায়, উৎসবে, অনুষ্ঠানে।

এরকমই একজন ভ্রাম্যমান প্রদর্শক ছিলেন স্বর্গীয় অনাদিনাথ বসু। এঁর কোম্পানির নাম ছিল ‘অরোরা বায়োস্কোপ’। অরোরা-র বর্তমান কর্ণধার অঞ্জন বসু বলেন অরোরার সূচনা ১৯০৬ সালে। Amrita Bazar Patrika, Centenery Suppliment- (22.03.1968) Page 105, পাওয়া যায় অরোরার শুরু ১৯০৮ সালে। তবে সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই সূচনা হয়েছিল অরোরার, কারণ ভ্রাম্যমান প্রদর্শনীর ব্যাবসা দ্বিতীয় দশক থেকে আর খুব একটা লাভজনক থাকেনি।

শুরুতে অরোরার প্রদর্শনক্ষেত্র সীমিত ছিল এবং এটি অনাদিনাথ বসু-র মূল ব্যাবসা ছিলও না। প্রাথমিকভাবে নতুন মাধ্যমটির প্রতি আবর্ষণহেতু চলচ্চিত্র ব্যাবসার প্রতি আগ্রহী হলেও ক্রমশ তিনি ব্যাবসাটির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতেরও ইঙ্গিত পান। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ছিল বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ। অর্থাৎ (ক) প্রদর্শনীর জন্য বৃহত্তর ভৌগোলিক ক্ষেত্র। কিন্তু সীমিত ধারণা নিয়ে বৃহত্তর প্রদর্শনীক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অর্থাৎ (খ) প্রয়োজন আরও একজন ভ্রাম্যমান প্রদর্শকের সাথে যুক্ত হওয়া, যিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ, এবং সর্বোপরি (গ) নিজেদের অস্তিত্ব সুনিশ্চিত করার জন্য একটি স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক পরিকল্পনা।

এরই ফলশ্রুতি, ১৯১১ সালে ‘অরোরা সিনেমা কোম্পানী’র সূচনা। (যদিও কালীশ মুখোপাধ্যায় এর কাছে অরোরা-র উত্থান প্রসঙ্গে দেবী ঘোষের সাক্ষাৎকার কিছুটা অন্যরকম, তথাপি… উল্লেখ্য, এই সময় থেকেই অনাদিনাথ বসু চলচ্চিত্র ব্যাবসার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সম্ভবত সেই কারণেই অধিকাংশ তথ্যেই অরোরা- র সূচনাকাল ১৯১১ সাল হিসাবেই চিহ্নিত।

অরোরা বায়োস্কোপ’ থেকে ‘অরোরা সিনেমা কোম্পানী’

১৯১১ সালে তৈরি হল ‘অরোরা সিনেমা কোম্পানী’। দেবী ঘোষ, যিনি পরে অরোরার ক্যামেরাম্যান হয়েছিলেন, এবং চারু ঘোষের সাথে যৌথ উদ্যোগে তৈরি অনাদিনাথ বসুর এই নতুন অফিসের ঠিকানা হল, ২ ডি, কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিট। এই সময় থেকেই অরোরা পাকাপাকিভাবে চলচ্চিত্র ব্যাবসার সাথে যুক্ত হল। শুধু তাই নয়, খণ্ডচিত্র প্রদর্শনীর মাঝখানে খণ্ড নাটকের দৃশ্য অভিনয়, ম্যাজিক, তীর-ধনুকের খেলা প্রভৃতি দেখানোর জন্য তারা কলকাতার ভেনাস থিয়েটারকেও সাথে যুক্ত করলেন। তৈরি করলেন ‘অরোরা টুরিং পার্টি’, যারা সারা বাংলা এবং সংযুক্ত রাজ্যগুলি এমনকি আসাম পর্যন্ত ছবি নিয়ে পৌঁছে গেলেন। একইসঙ্গে তারা কিছু আমন্ত্রণও পেতে থাকলেন। যেমন ১৯১১ সালেরই ১০ ডিসেম্বর তারা মজফ্রপুরে, মি. এবং মিসেস কেনেডির কন্যার বিবাহোৎসবে চিত্র প্রদর্শনীর আমন্ত্রণ পান। একইভাবে, বনেলীর রাজা ঠাকুরদাস চন্দের পূর্ণিয়াস্থিত রাজবাটাতেও আমন্ত্রণ পেয়েছিল ‘অরোরা’। তারা প্রথমদিকে ছবি আনত ‘প্যাথে অ্যান্ড কোম্পানি’ থেকে। পরে আমেরিকার ‘ক্রিস্টোন কোম্পানি’র ছবি তারা দেখাতেন। আর এই সমস্ত খণ্ডচিত্র দেখিয়ে খুব অল্পদিনেই সাফল্য লাভ করল অরোরা।

কিন্তু শুধুই সাফল্য নয়, অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদও ছিল সেই সঙ্গে। কারণ ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি ‘রয়েল বায়োস্কোপে’র চূড়ান্ত সাফল্য, দ্রুত উত্থান এবং পতন। তাই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে প্রয়োজন হল একাধিক বাণিজ্যিক পরিকল্পনা।

সিনেমা আর ব্যাবসা

নির্বাক যুগে যেসব বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিয়েছিল অরোরা, তা পুঁজিবাদের অন্তর্গত যেকোনো শিল্পবিকাশের গঠনমূলক প্রক্রিয়াগুলোর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যেমন, বাজার দখলের চেষ্টায় একজন ভ্রাম্যমান প্রদর্শক হিসাবে অনাদিনাথ বসু যুক্ত হলেন আর একজন ভ্রাম্যমান প্রদর্শক দেবী ঘোষের সাথে যিনি ইতিপূর্বেই তার বায়োস্কোপ এবং গ্রামোফোন মেশিন নিয়ে বাংলার প্রায় সমস্ত জেলা ঘুরে বেড়িয়েছেন। আবার ভেনাস থিয়েটারের সাথে যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ একটা দল করার প্রচেষ্টা, যেহেতু এই সময়ের ইতিহাস খুব সুলিখিত নয়, আমরা জানতে পারি না, এরকম আনুভূমিক সংযুক্তিকরণ আরও হয়েছিল কি না।

সিনেমার ব্যাবসায় নিজেদের অস্তিত্ব সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ, যেমন ক্রমশ যন্ত্রপাতি কেনা, ফিল্ম প্রসেসিং-এর জন্য ল্যাবরেটরি তৈরি করা, ছবি প্রযোজনায় বিনিয়োগ করা, স্টুডিও তৈরি ইত্যাদি, শুরু হয় এই সময় থেকেই।

১৯১৬ সালের মধ্যেই অরোরা তাদের প্রদর্শন যন্ত্র একটা থেকে বাড়িয়ে আটখানা করে ফেলেছিল। ১৯১৬-১৭ সাল নাগাদ হীরালাল সেনের দুটি ক্যামেরা, একটি উইলিয়ামসন ও একটি প্রিফেক্ট, তাদের হাতে আসে যা দিয়ে দেবী ঘোষ তার চিত্রগ্রহণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। এই সময় থেকেই অরোরা তৈরি করতে শুরু করে হালকা সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘অরোরা টুকিটাকি’। বিষকন্যা, কৃষ্ণকান্তের উইল, মেঘনাদবধ, চন্দ্রশেখর, বাসবদত্তা প্রভৃতি বিভিন্ন নাটকের খণ্ডদৃশ্যও তারা চিত্রগ্রহণ করে। অরোরাই প্রথম বাঙালি প্রতিষ্ঠান যারা পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনিচিত্র “রত্নাকর” তৈরি করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি পরে মুক্তি পায় (১৯২১ সালের ১৩ আগস্ট, রসা থিয়েটারে) এবং ইন্দো-ব্রিটিশ কোম্পানির “বিলেত ফেরৎ” ছবিটি পরে তৈরি হলেও আগে মুক্তি লাভ করে প্রথম স্থান পায় ইতিহাসে। এরপর থেকে অরোরা আস্তে আস্তে একাধিক নির্বাক ছবি তৈরি শুরু করে।

১৯২৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর, ইন্ডিয়ান সিনেম্যাটোগ্রাফ কমিটির সাথে অনাদিনাথ বসু ও তার কয়েকজন সতীর্থদের কথোপকথনে দেখা যায়, দর্শকরা চাইত বাংলা ছবি দেখতে। তাও আবার পৌরাণিক কাহিনি নির্ভর বা হাস্যকৌতুকের জনপ্রিয়তাই ছিল বেশি। (বিদেশী খন্ডচিত্রের যে তাৎক্ষণিক আনন্দ ছিল, কাহিনিচিত্রের দীর্ঘরূপ এবং অপরিচিত সংস্কৃতি, গ্রামের দর্শকদের কাছে ক্লান্তিকর হয়ে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছিল)।

এমনকি অন্যান্য ভাষার ভারতীয় ছবি বাংলা অন্তঃলিখন সহযোগে প্রদর্শনও জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু বাংলা ছবির প্রদর্শনের খরচ ছিল প্রচুর। একটি বিদেশী ছবি তিন-চার দিনের জন্য যে দামে পাওয়া যেত, ম্যাডানদের কাছ থেকে একটা বাংলা ছবি ভাড়া নিতে একদিনের জন্য তার পাঁচ-ছয় গুন দাম দিতে হতো। সম্ভবত এই কারণেই অরোরা চিত্র নির্মানে আগ্রহী হয়ে ওঠে। যেখানে একদিকে ছবিগুলি তাদের প্রদর্শন ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়, আবার একইসাথে অন্যান্য ভ্রাম্যমান প্রদর্শকদেরও ভাড়া দেওয়া যায়।

তারপর, ‘অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন’

১৯২১ সাল থেকে অরোরা কাহিনিচিত্র প্রযোজনা শুরু করে এবং নির্বাক যুগে মোট সাতটি পূর্ণদৈর্ঘের ছবি তৈরি করে। অহীন্দ্র চৌধুরী তার আত্মজীবনী নিজেরে হারায়ে খুঁজি গ্রন্থে অরোরার ছবি প্রসঙ্গে লিখেছেন, ম্যাডানদের নির্মিত ছবিগুলি বাঙালী সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি। তাই সেইসব ছবিগুলির গ্রহণযোগ্যতাও কম ছিল দর্শকদের কাছে। পক্ষান্তরে অরোরার নির্বাক ছবিগুলি দর্শকদের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। কাহিনিচিত্রের নির্মাণ ছাড়াও অরোরা পাশাপাশি প্রচুর তথ্যচিত্র নির্মানও শুরু করে। সেসময় সেগুলিকে বলা হত টপিক্যালস। ইতিমধ্যে ৪১ নং কাশীমিত্র ঘাট স্ট্রিটে স্থানান্তরিত হয়েছিল অরোরার অফিস। ১৯২১ সালে তা পুনরায় স্থানান্তরিত হয় ১ নং রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিটে। এই সময়ই এখানে তৈরি হয় অরোরা ফিল্ম ল্যাবরেটরি। অরোরার ছবিগুলির পরিস্ফুটন, প্রিন্ট ও সম্পাদনা করা হত এখানেই। রাজবল্লভ স্ট্রিটের রসায়নাগারে আগুন লাগলে, পুড়ে যায় বহু ফিল্মের নেগেটিভ। ১৯২৯ সালে, বাগবাজারের কাঁটাপুকুরে নতুন করে ফিল্মল্যাব তৈরি করা হয়। এই সময়ই অনাদিনাথ বসু অরোরার আরো সম্প্রসারণের কথা ভাবেন। আরো বৃহত্তর বাজারে বাণিজ্যের পক্ষ্যে একজন মাদ্রাজি ব্যক্তি মি.জি. রামশেসান-এর সাথে একত্রে তৈরি করলেন ‘অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশান। ১৯২৯ সালে। ‘অরোরা সিনেমা কোম্পানি’ থেকে পৃথক এই অফিসের ঠিকানা হল ১২৫. ধর্মতলা স্ট্রিট। এইভাবে একটি স্থানীয় ভ্রাম্যমান প্রদর্শন সংস্থা থেকে অরোরার উত্তরন ঘটল বৃহত্তর পরিবেশন সংস্থায়। ১৯৩০ সালে দেনার দায়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রমথেশ বড় য়ার মূলেন স্ট্রিটের বড়য়া স্টুডিও কিনে নেন অনাদিনাথ বসু। যদিও নিজেদের স্টুডিও তৈরি করতে আরো ছয় বছর লেগে যায় ১৯৩৬ সালে, বাগমারি ফুলবাগান অঞ্চলে নারকেলডাঙ্গা নর্থ রোডে বিনোদবিহারী সাহার একটি বাগানবাড়িতে তৈরি হয় অরোরা স্টুডিও।

অরোরা (১৯৩১-১৯৫০)

বিশের দশক থেকেই বাংলা ছবির বাজার ক্রমশ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে ছবি তৈরির সংখ্যা। বাজারের সিংহভাগ আধিপত্য ম্যাডানদের থাকলেও, কিছু অপেক্ষাকৃত ছোটো সংস্থাও অনিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র প্রযোজনার সাথে যুক্ত ছিল। যেমন এই বিশেষ দশকেই ‘পি ইন্ডে-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি’ (৩টি ছবি), ‘ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেড’ (৮টি ছবি), ‘ইন্ডিয়ান সিনেমা আর্টস’ (৭টি ছবি), ‘তাজমহল ফিল্ম কোম্পানি’ (৮টি ছবি) প্রভৃতিদের ছবি তৈরি করতে দেখা যায়।

কিন্তু ছবিতে শব্দ প্রয়োগের ধারা, প্রযোজনার ক্ষেত্রে বড়ো রকমের পরিবর্তন আনল। শব্দযুক্ত ছবি তৈরির ব্যয়ভার এত বেড়ে গেল, যা বহন করতে না পারায় নির্বাকযুগের অধিকাংশ সংস্থাকেই আর পাওয়া গেল না সবাক যুগে। এমনকি ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে একাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার হদিশ পাওয়া যায় যারা মাত্র ১টি করে ছবি তৈরি করে বন্ধ হয়ে যায়। খুব অল্প কয়েকটি সংস্থা নির্বাক থেকে সবাক যুগে পৌঁছেছিল। যেমন, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রাফট (১৯৩১ সালে এরাই পরিবর্তিত হয় নিউ থিয়েটার্স লিমিটেড-এ), রাধা ফিল্মস, বড়য়া ফিল্ম ইউনিট প্রভৃতি। এবং এদের সাথে অরোরাও।

কিন্তু নিউ থিয়েটার্স যেভাবে, সবাক চিত্র প্রযোজনার প্রয়োজনে দ্রুত নিজেদের পরিবর্তন করে, নতুন উৎপাদন পরিকাঠামো নিয়ে অবিরত ছবি প্রযোজনার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের স্টুডিও যুগের সূচনা করল, সেভাবে সরাক যুগে পদার্পন করল না অরোরা। কিছুটা পুরনোপন্থি মনোভাব (১৯৩৪ সাল পর্যন্ত অরোরা নির্বাক ছবি তৈরি করে চলছিল এবং সে-বছর মাত্র ১টি নির্বাক ছবি তৈরি হয় ‘নিয়তি’। প্রযোজক ছিল অরোরা।) বা হতে পারে পরিবর্তিত বাজার সম্বন্ধে সংশয় বা দ্বিধা এই পর্বে অরোরা তাদের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে নিয়েছিল।

একটি মৌলিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা

নির্বাক যুগে তাদের মূল ব্যাবসা ছিল ছবির প্রদর্শন। ১৯২৯ থেকে তারা ক্রমশ পরিবেশনার দিকে ঝুঁকল এবং পরের দুই দশক ধরে এটিকেই মূল ব্যাবসায় পরিনত করল। নিউ থিয়েটার্সের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা এড়াতে ছবির উৎপাদন ব্যাবসাকে তারা গৌন হিসাবেই রাখল। বরং তারা বেশি জোর দিয়েছিল স্টুডিও ফ্লোর, ক্যামেরা, শব্দযন্ত্র, পরিস্ফুটন, ল্যবরেটরি, এমনকি লোকবলকেও অন্যদের প্রযোজনার প্রয়োজনে ভাড়া দেওয়ায়। অর্থাৎ স্টুডিও যুগের চলচ্চিত্র ব্যাবসার যেটা মূল ধারা, তার সমান্তরাল অন্য একটি বা বলা যায় প্রায় বিপরীত একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বাজার দখলের চেষ্টা করল অরোরা। বাজারকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, প্রযোজনা, পরিবেশনা এবং প্রদর্শনের সম্পূর্ণ পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও, অরোরা কিন্তু হলিউড স্টুডিও সিস্টেমের ব্যাবসা-পদ্ধতি অনুসরণ করেনি। এই পর্যায়ে যে কেন্দ্রীকরণ হওয়া উচিত ছিল, অরোরা তার বিপরীত বা বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাল তাদের ব্যাবসার। যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্র বা ইউনিট স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং উপার্জনক্ষম। কোনো একটির ক্ষতি কখনোই সমগ্র ব্যাবসাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে না। বলা বাহুল্য, এই পরিবর্তিত পরিকল্পনাই শেষপর্যন্ত অস্তিত্ব রক্ষায় সাহায্য করেছিল অরোরাকে।

ছবি প্রদর্শন

১৯২৯ সালে ছবি পরিবেশনের জন্য আলাদা কোম্পানি তৈরি করার পর, এতদিনের মূল ব্যাবসা বা ছবির প্রদর্শনের প্রতি অরোরার আগ্রহ কিছুটা কমে যায়। যদিও পরের দুই দশক তাদের এই প্রদর্শন ব্যাবসা সক্রিয় ছিল এবং তা ছিল ‘অরোরা- সিনেমা কোম্পানি’র নিয়ন্ত্রণে। নির্বাক যুগে তাঁবু প্রদর্শনী ছাড়াও কিছু সিনেমা হলের সাথে যোগাযোগ ছিল। তিরিশের দশকে যখন সিনেমার বাজার খুব দ্রুত বাড়ছিল, সিনেমা হল তৈরির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অরোরাও কিছু স্বাধীনভাবে, কিছু যৌথভাবে সিনেমা হল তৈরি করে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত এই প্রদর্শন ব্যাবসা খুব ভালোই চলেছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পর অধিকাংশ সিনেমা হল রয়ে গেল পূর্ব পাকিস্থানে (অধুনা বাংলাদেশ)। পশ্চিমবঙ্গে অরোরার দুটি সিনেমা হল ছিল ‘অরোরা টকীজ’ নামে। একটি খড়গপুর ও একটি মেদিনীপুরে। তবে ১৯৪৭ সালের পর থেকে অরোরার প্রদর্শন ব্যাবসা একেবারে কমে যায়।

ছবি পরিবেশন

স্টুডিও যুগে অরোরার আসল সাফল্য ছবির পরিবেশন ব্যাবসায় যার শুরু ১৯২৯ সালে পৃথকভাবে তৈরি সংস্থা ‘অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন’ এর মাধ্যমে। ১৯৩৩ সালে তারা মাদ্রাজে শাখা অফিস খোলে। রেঙ্গুনেও তারা অফিস তৈরি করে প্রাচ্যের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে। ১৮ জুলাই, ১৯৩২ সালের একটি চুক্তিপত্রে দেখা যায় গোঁরগাঁও এর ‘মহিন্দ্রাকর ফিল্ম সার্ভিস’, ‘দি মহারাষ্ট্র ফিল্ম কোম্পানি’ এবং ‘কোহিনুর ইউনাইটেড আর্টিস্ট’-এর তৈরি ছবিগুলো বাংলা, বিহার, আসাম, ওড়িশা এবং বার্মায় পরিবেশনার জন্য ২ বছরের চুক্তিতে অবোরাকে নিয়োগ করে। ১৯৩০ সালের ডিসেম্বর থেকে তারা বোম্বের ‘ইম্পিরিয়াল ফিল্ম কোম্পানি’র তৈরি নির্বাক ছবির পরিবেশন শুরু করে। এসময় ইম্পিরিয়াল প্রতিমাসে দুটি করে ছবি পাঠাত। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে তারা ইম্পিরিয়ালের ৩৭টি ছবি পরিবেশন করেছিল।

ইতিমধ্যে ১৯২৯ সাল থেকেই বিদেশী সবাক ছবি ভারতে আসতে শুরু করেছে। অরোরা ছিল ‘কলম্বিয়া টকিজ’-এর ছবির ভারত, বার্মা এবং সিলোন এর একমাত্র পরিবেশক। কলম্বিয়া টকিজ এর ১৭টি ছবির পরিবেশনা করেছিল অরোরা। এছাড়াও অরোরা ‘গ্লোব থিয়েটার’-এর একাধিক নির্বাক ও সবাক ছবি ১৯৩২ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে পরিবেশন করে। এর মধ্যে এক-দুই রিলের ‘এম্পায়ার নিউজ বুলেটিন’ ছিল অসংখ্য। পরবর্তীকালে এর আদলেই স্ক্রিন নিউজ তৈরি করত অরোরা।

কিন্তু বাজারে ততদিনে ভারতীয় ছবির চাহিদা বেড়ে গেছে এবং ‘আলম আরা’ যেই মুক্তি পেল, তা অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করল। ৩১ মার্চ ১৯৩১ সালে লেখা একটি চিঠিতে অরোরা ‘ইম্পিরিয়াল ফিল্ম কোম্পানি’র কাছে ‘আলম আরা’-র ডিস্ট্রিবিউশান চায়। কিন্তু অরোরা ‘আলম-আরা’ পায়নি। তাই, এরপর যখনই, ‘নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও’ বাংলা সবাক ছবি নির্মাণ শুরু করল, অরোরা তৎক্ষণাৎ তাদের সাথে ব্যাবসা করতে উদ্যোগী হল।

নিউ থিয়েটার্সের সাথে ব্যাবসা শুরু হয় নিম্নলিখিত কমিশন-এর ভিত্তিতে —

বাংলা, বিহার, ওড়িশা, আসাম এবং বার্মা

কলকাতা

(ক) চিত্রা এবং নিউ সিনেমা – ০ শতাংশ

(খ) পূর্ণ থিয়েটার, হাওড়া সিনেমা বা উপরোক্ত ভৌগলিক ক্ষেত্রের যেকোনো নিউ থিয়েটার্সের সিনেমা – ৭/ শতাংশ [মোট আয়ের]

(গ) কলকাতার অন্যান্য সিনেমা – ১০ শতাংশ [মোট আয়ের]

কলকাতা ভিন্ন অন্যত্র সমস্ত সিনেমা হলে – ১৫ শতাংশ [মোট আয়ের]

মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি, মহীশূর, সিলোন এবং দক্ষিণ ভারতের সমস্ত বুকিং-এর জন্য – ২০ শতাংশ[মোট আয়ের]

২৪ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে নিউ থিয়েটার্সকে লেখা একটি চিঠিতে অরোরা, নিউ থিয়েটার্সের ছবিগুলি ভারতের বাইরে, ইন্দো-চায়না, শ্যাম, ফিজি, মালয়, ডাচ-ইন্ডিজ পরিবেশন করতে চায়। (অর্থাৎ এই সময় অরোরা ছবি পরিবেশনার বাজার বহুদূর বিস্তৃত করে ফেলেছিল)। অতঃপর একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয় ১৯৩৭ সালের ৫ জুলাই। নিউথিয়েটার্স, অরোরাকে বাংলা, বিহার, ওড়িশা, আসাম এবং বার্মায় তাদের ছবির একমাত্র পরিবেশক হিসাবে নিযুক্ত করে পরবর্তী ছয় বছরের জন্য। এই ছয় বছরে, গড়ে তিনটি করে মোট ১৮টি ছবি দেবার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় নিউ থিয়েটার্স। অরোরাও অগ্রিম হিসাবে পঁচাত্তর হাজার টাকা দেয় নিউ থিয়েটার্সকে। যদিও অরোরা গোটা স্টুডিও যুগ ধরেই নিউ থিয়েটার্সের ছবিগুলির একমাত্র পরিবেশক ছিল কারণ ১৯৪৫ সালের ২ মে, কিছু পরিবর্তন ও সংযোজন করে পুনরায় একটি চুক্তিপত্র সাক্ষরিত হয় পরবর্তী ছয় বছরের জন্য।

নিউ থিয়েটার্স-এর ছবি ছাড়াও, স্টুডিও যুগে অরোরা আরো কিছু প্রযোজনা সংস্থা যেমন কমলা মুভিটোন, কালী ফিল্মস্, গান্ধর্ব সিনেটোন, প্রফুল্ল পিকচার্স, এশিয়াটিক ফিল্মস্, লীলময়ী পিকচার্স লিমিটেড, এস, এম, প্রোডাকশান, ক্যামেরা কলাম প্রমুখদের কিছু ছবিও পরিবেশন করে। তবে এই সময় অরোরার আসল সাফল্য ছিল নিউ থিয়েটার্সের ছবিগুলি একমাত্র পরিবেশক-এর ভূমিকা।

ছবি প্রযোজনা

চলচ্চিত্র ব্যাবসার নিরিখে এই পর্বে প্রযোজক হিসাবে অরোরার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকলেও বাংলা তথ্যচিত্রের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে অরোরার অবদান ছিল অপরিসীম। প্রাথমিকভাবে পরিকাঠামোর অভাব থাকায়, এই সময় কাহিনিচিত্র নির্মাণে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি অরোরা। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত নির্বাক চিত্র তৈরি করেছিল তারা। এরপর যখন বুঝল, নির্বাক ছবির সত্যিই আর ব্যাবসা সম্ভব নয়, যৌথভাবে ছবি তৈরির চেষ্টা করল অরোরা। নিজেরা এককভাবে প্রথম সবাক বাংলা ছবি নির্মাণ করল ১৯৪২ সালে এবং তারপরও খুব অনিয়মিতভাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি যদিও ছবি তৈরির অবস্থাকে বিঘ্নিত করেছিল, তথাপি কাহিনিচিত্রের প্রযোজনায় বিশেষ আগ্রহীও ছিল না অরোরা। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত (গোটা ৪০-এর দশকে) মাত্র চারটি বাংলা ছবি নির্মাণ করেছিল অরোরা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এসময়, তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রতি অরোরার প্রভূত আগ্রহ দেখা যায়। বিশ, ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকে অসংখ্য তথ্যচিত্র (টপিকণলস) নির্মাণ করেছিল অরোরা। যে অভ্যাসের সূচনা হয়েছিল ‘অরোরা টুকিটাকি’ তৈরির মধ্যে দিয়ে, তারই পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ত্রিশের দশকে টপিক্যালস্ বা পরবর্তী সময়ে ‘অরোরা স্ক্রিন নিউজ’।

টপিক্যালগুলি মূলত বাংলা সরকারের আর্থিক দাক্ষিণ্যে তৈরি হত বা অনেকসময় অরোরা নিজেও তৈরি করত যা সরকারের তরফ থেকে কিনে নেওয়া হত বা ভাড়া নেওয়া হত। এগুলি বিভিন্ন বিষয়ে ভাগ ছিল যেমন খেলাধুলা, ব্যাবসা সম্বন্ধীয়, প্রোপাগান্ডা, স্বাস্থ্য বিষয়ক, রাজনৈতিক, কৃষি, সেচ, পাবলিসিটি প্রভৃতি। আবার কিছু-কিছু সচেতনতা তৈরির ছবি যেমন কলেরা, স্মল পক্স, টিউবারকুলেসিস, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, ভিলেজ রিকনস্ট্রাকশান ইত্যাদিগুলি ছোটো কাহিনিচিত্রের আদলে তৈরি হয়েছিল।

১৯৩৮ সাল থেকে অরোরা ‘স্ক্রিন নিউজ’ তৈরি শুরু করে। এগুলি ছিল সমসাময়িক ঘটনাবলীর চিত্ররূপ যার সাথে আজকের দিনের টেলিভিশনের হালকা সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠানের তুলনা করা চলে। কিছু সংবাদচিত্র ছিল ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশিত কাজ যেমন, লর্ড ব্রাবোন-এব অন্তিম যাত্রা, পঞ্চম জর্জকে বাংলার সম্মান জ্ঞাপন, বাংলার গভর্ণর স্যার জন হার্বাটের আগমন ইত্যাদি। আবার কিছু জাতীয়তাবাদী সংবাদ চিত্র যেমন, ওয়েলিংটন স্কোয়ারে AICC-র সভা এবং জহরলালের ভাষণ, হিন্দু মহাসভা, রামগড় কংগ্রেস এবং অসহযোগ সংক্রান্ত আলোচনা ছিল। পাশাপাশি কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল হলের উদ্বোধন, ফরিদপুরে বাংলা চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে আলোচনা, মহাজাতি সদনে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন রবীন্দ্রনাথ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর বক্তৃতা প্রভৃতিও ধরা ছিল তাদের সংবাদ চিত্রে। এছাড়া কিছু খেলাধুলা সংক্রান্ত, কিছু ভ্রমণ বিষয়ক সংবাদচিত্রও বানিয়েছিল অরোরা। ১৯৪৬ সালের এক অগ্নিকান্ডে অধিকাংশ সংবাদচিত্রই নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীকালে কিছু সংবাদচিত্রকে অরোরা তথ্যচিত্রের আদলে রিলিজ করে যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তিম যাত্রা, মহাত্মা গান্ধী প্রভৃতি। স্বাধীনতার পরে, ফিল্ম ডিভিশন তৈরি হবার পরে, যখন তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু হয়, অরোরা তাদের সংবাদচিত্র তৈরির সংখ্যা কমিয়ে দেয়। যদিও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তারা সংবাদচিত্র (মোট ৫১টি) তৈরি করেছিল।

এসময় অরোরা বিভিন্ন সংস্থার জন্যও ছবি তৈরি করে। যেমন ‘ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপ্যানশান বোর্ড’, ‘ইন্ডিয়ান রেডক্রস সোসাইটি’, ‘বার্মা শেল’ প্রভৃতি। ১৯৪০ সালের ২৩ ডিসেম্বর ‘বোর্ন অ্যান্ড শেপার্ড’কে লেখা একটি কোটেশানে অরোরা প্রত্যেক হাজার ফিট সবাক ছবির জন্য চার টাকা ও প্রত্যেক হাজার ফিট নির্বাক ছবির জন্য দুই টাকা আট আনার হিসাবে প্রস্তাব দেয়।

প্রযোজনা সহায়তা

স্টুডিও ফ্লোর, যন্ত্রপাতি, ল্যাবরেটরি সুবিধা ইত্যাদি ভাড়া দেওয়া ছিল অরোরার আর একটি রোজগার। ৩৫ মি.মি. ফিল্ম থেকে ১৬ মি.মি. তে রিডাকশান, –  তারা একসময় পূর্ব ভারতে একচেটিয়া ব্যাবসা করে। ডিব্রুগড়ের মি. রোহিনী কুমার বড়য়ার সাথে ১৬/১১/১৯৪০ তারিখের একটি চুক্তিপত্রে দেখা যায় ফিল্মের কাঁচামাল, ক্যামেরা, ক্যামেরাম্যান, শব্দযন্ত্র এবং তার টেকনিশিয়ান ইত্যাদি সরবরাহ করে ছবি করার জন্য চোদ্দো হাজার টাকার বাজেট দিয়েছিল অরোরা। ১০/৬/১৯৪৩ তারিখে এস.ডি. প্রোডাকশানকে লেখা একটি চিঠিতে দেখা যায়, সেসময় পূর্ণ সময় বা ৮ ঘণ্টার জন্য স্টুডিও ফ্লোর ভাড়া ছিল ৩০০ টাকা, অর্ধেক সময়ের জন্য ১৫০ টাকা। এরকম বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থার সাথে চুক্তি পাওয়া যায় যাদের স্টুডিও ফ্লোর, যন্ত্রপাতি বা টেকনিশিয়ান ভাড়া দিয়েছিল অরোরা। যেমন

১৬/১০/১৯৪১ খগেন্দ্রলাল চট্টোপাধ্যায়ের সাথে ‘অভয়ের বিয়ে’ ছবির জন্য।

১৭/১/১৯৪৩ মুরলিধর চ্যাটার্জীর সাথে ‘ছদ্মবেশী’ ছবির জন্য।

০৫/০৫/১৯৪৪ ভারতী চিত্রপীঠ এর সাথে ‘নারীজন্ম’ ছবির জন্য ।

১৩/০৯/১৯৪৪ ছায়াচিত্র মন্দির এর সাথে ‘দুষ্টগ্রহণ’ ছবির জন্য।

১৩/০৯/১৯৪৮ লীলাময়ী পিকচার এর সাথে ‘বিষের ধোঁয়া’ ছবির জন্য।

…ইত্যাদি।

এই চতুর্থ ব্যাবসাটি থেকে অরোরা-র সবসময় একটা নিয়মিত উপার্জন ছিল।

অর্থাৎ, অরোরা-এপর্যন্ত যাত্রাপথ

১) প্রাথমিকভাবে প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে সুনিশ্চিত করা।

২) তারপর সরাসরি প্রতিযোগীতা এড়িয়ে গিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নতুন নতুন পথ খুঁজে বের করে নিজেদের একটা সমান্তরাল অস্তিত্ব খুঁজে নেওয়া। সেখানে একচেটিয়া ব্যাবসা করার চেষ্টা এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা।

৩) বেশি ঝুঁকি না নিয়ে কম বিনিয়োগ এবং সুনিশ্চিত স্বল্প লাভের মধ্যেই ব্যাবসাকে নির্দিষ্ট রাখা।

৪) বাজারের এমন একটি অংশকে ধরা, যেটা বিশেষ পরিবর্তনশীল নয় এবং যেখান থেকে স্থির বা নির্দিষ্ট আয় সম্ভব।

ব্যাবসার বিকেন্দ্রীকরণ পরিকল্পনা অরোরার অস্তিত্বের ভিত এতটাই শক্ত করে দিয়েছিল যে পঞ্চাশের দশকে, স্টুডিও যুগ অবসানের সময়, সিনেমার অকস্মাৎ বাজার পরিবর্তন, অরোরাকে বিশেষ ক্ষতি করতে পারেনি।

অরোরা (১৯৫১- ১৯৮২)

স্বাধীনোত্তর সময়ে এসে অরোরার প্রদর্শন ব্যবস্থা গতিহীন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পরে ছবির বহির্দেশীয় বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের ফলে বিদেশে ছবি পরিবেশনার বাজারও নষ্ট হয়। কেবলমাত্র বাংলা ছবির পরিবেশক হিসাবে অরোরার বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে। তথ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও, এসময় ফিল্ম ডিভিশনের আবির্ভাব ঘটে। ফলে অরোরা তথ্যচিত্র তৈরি কমিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে ১৯৪৫ সালে অনাদিনাথ বসুর মৃত্যুর পর তার পুত্র অজিত বসু অরোরার দায়িত্ব নেন। তিনি অরোরার কাহিনিচিত্র প্রযোজনার দিকটি (যেটি ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকে গৌণ ছিল) সক্রিয় করতে উদ্যোগী হন।

পঞ্চাশের দশকে নিউ থিয়েটার্স ছবি তৈরি বন্ধ করে দিলে, বাংলা কাহিনিচিত্রে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এসময় অরোরা কাহিনিচিত্রে নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তবে এবারও, সমসাময়িক বাংলা ছবির যে মূল ধারা, তার বাইরে এসে একটা অন্যরকম প্রচেষ্টা করে অরোরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে একাধিক স্বাধীন প্রযোজক চলচ্চিত্র ব্যাবসায় বিনিয়োগ করে এবং ছবি নির্মাণের খরচ হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেয়। একইসাথে শুরু হয় তারকা প্রথা। কিন্তু অরোরা কাহিনিচিত্র নির্মাণ করতে থাকে আরো একবার পুরোনো স্টুডিও প্রথার আদলে এবং তারকা প্রথাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে। (এর একটা কারণ অবশ্যই স্বল্প খরচে ছবি তৈরির চেষ্টা, যা এপর্যন্ত সবসময়ই করে এসেছে অরোরা। কারণ একটা আঞ্চলিক ছবির খরচ যদি কম না করা যায়, অনিশ্চিত বাজার, অর্থাৎ পরিবর্তিত বাজার সম্বন্ধে সংশয় এবং নতুন প্রযোজকদের সাথে সরাসরি প্রতিযোগীতায় নামার দ্বিধা ছিল অরোরার)। তাই অরোরা চেষ্টা করেছিল প্রতিযোগীতা এড়িয়ে মূলধারার বাইরে একটা বাণিজ্যিক পরিকল্পনার। ফলে, যখন এখানে স্টুডিও সিস্টেম সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, এমনকি হলিউডেও যখন স্টুডিও সিস্টেম পরিত্যক্ত, তখন অরোরার এই পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবেই ছবি তৈরির ভাবনা চিন্তা, বিষয় নির্বাচনকেও প্রভাবিত করে। তৎকালীন উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক জুটির জনপ্রিয় আঙ্গিকের বদলে অরোরা তৈরি করতে থাকে পৌরাণিক (প্রহ্লাদ, জয়দেব), জীবনীধর্মী (রাজা রামমোহন, ভগিনী নিবেদিতা) প্রভৃতি ছবিগুলি। এমনকি সামাজিক ঘটনা নির্ভর মেলোড্রামা, যেমন ‘দুরন্ত জয়’ ছবিতে নবাগত ভাষ্কর এবং শমিতা বা ‘রাধাকৃষ্ণ’ ছবিতে উত্তর ব্যানার্জী এবং সঞ্চিতা প্রমুখদের নিয়ে কাজ করতে থাকে অরোরা। একটা ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি, একটা সমান্তরাল অস্তিত্বের দাবী এইভাবেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের এই পর্যায়ে নির্মিত ছবিগুলিতে।

‘খেলাঘর’, ‘বোধদয়’, ‘ছুটির দিনে’ (১৯৫১)

অরোরা প্রথমে ‘খেলাঘর’ ছবিটি নির্মাণ করেছিল। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য ছবিটি যথেষ্ট বড়ো ছিল না। তাই ‘বোধদয়’ এবং ‘ছুটির দিনে’ নামক আরো দুটি ছোটো ছবি তৈরি করে। তিনটি ছবি একত্রে মুক্তি পায়। ৩০/০৬/১৯৫১ তারিখে Hindustan Standard লেখে, ‘A delightful package of juvenile entertainment’। যুগান্তব পত্রিকায় (২২/৬/১৯৫১) চিত্রমুক্তি বিভাগে লেখা হয়, ইতিপূর্বে এরা ‘হাতেখড়ি’, ‘দ্বিতীয় পাঠ’, ‘সব পেয়েছি আসর’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘জয়তু নেতাজী’ ইত্যাদি যে ছবিগুলি তুলেছেন সেগুলো মাত্র দু-এক রিলের। এইসব ছবি দেখে ছেলেমেয়েরা এমনকি তাদের অভিভাবকরাও অনুপ্রাণিত হয়ে বড়ো করে ছোটোদের ছবি করার জন্য অনুরোধ জানান। তারই ফলে অরোরা যে দুখানি ছবি তৈরি করে তার নাম ‘খেলাঘর’ ও ‘বোধদয়’। Amrita Bazar Patrika (1.7.1951) চিত্র সমালোচনায় লেখে, ‘Khelaghar easily enjoys the pride of position on the roster of the triple release. Directed and written by Soumyen Mukherjee, it is in many ways a remarkable attempt at film phantasy of the juvenile brand in which a young and poor orphaned thing is surprised one night into his unfulfilled dream surrounding a toy shop come true and visualises toys of animal and human beings assume the shape and throb of life, climaxed by a trip accross the starry sky to the moon.

Hindustan Standard (30.6.1951) চিত্র সমালোচনা করে, ‘Bodhodaya is a three reeler comedy written and directed by Niranjan Pal, which bring home the moral that work and play should not be mixed together to the detriment of both Chutir Diney is a nice travelogue in two reals which takes the audience on a sight-seeing tour of the Calcutta Zoological Gardens.’

বসুমতী, রূপ ও কথা, যুগান্তর প্রভৃতি পত্রিকায় তিনটি ছবির মধ্যে ‘খেলাঘর’ ছবিটিই সর্বপেক্ষা প্রশংসা পায়। আনন্দবাজার পত্রিকা (১/৭/১৯৫১) লেখে, ‘সরকারের এই ধরনের শিক্ষামূলক চিত্রকয়খানি প্রমোদকর মুক্ত করে দেওয়া উচিত।’ যদিও ভগ্নদূত পত্রিকায় (২০/৭/১৯৫১) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছবিগুলির বাজার তেমন ভালো হয়নি, মাত্র দুই সপ্তাহ চালেছিল।

‘প্রহ্লাদ’ (১৯৫২)

সাত রিলের এই ছোটোদের ছবিটি অরোরা তৈরি করেছিল ‘খেলাঘর’ ছবির সাথে, একসাথে মুক্তির পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু পরে, এটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি হিসাবেই মুক্তিলাভ করে। ছবিটিতে নয়খানি গান ছিল কীর্তন আঙ্গিকে। ২৫/১/১৯৫২ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকা লেখে, ‘পরিচ্ছন্ন প্রমোদ এবং সেইসঙ্গে শিক্ষামূলক চিত্র বিতরণে অরোরা ফিল্মস্ তার ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল তাদের নবতম ছবি প্রহ্লাদ-এও।

‘ Amrita Bazar Patrika (25.1.1952) চিত্র সমালোচনা করে, ‘This mythological film depicting the inspiring story of the unshakable devotion and faith of the boy Prahlad to lord Krishna and defied death largely dipped in the sacred pond of devotion and has been treated by director Phani Barma in an easy and simple way, divested of any straining oversubtle dramatic spinning out of situations, so that it can bring its lessons home straight to the hearts of the big multitudies devotionally inclined.”

Hindustan Standard (26.1.1952) -এ লেখা হয়, ‘The producers have filmized those (mythological) accounts in a manner that will appeal more to the common mass of picture goers than audience of a more higher level.’

‘পহ্লাদ’ অরোরা-র একটি বাণিজ্যসফল ছবি। অরোরা স্টুডিওতে প্রাপ্ত আয় ব্যয়ের তথ্য থেকে দেখা যায়, পরবর্তী কুড়ি বছরে (৫/১১/১৯৭৩ তারিখ পর্যন্ত) অরোরা ছবিটি থেকে দু লক্ষ আটাশ হাজার ছয়শো সাত টাকা ছাব্বিশ পয়সা (২,২৮,৬০৭.২৬) আয় করে যা মূল ছবির নির্মাণ খরচের প্রায় চারগুন ছিল।

‘মুস্কিল আসান’ (১৯৫৩)

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এর ‘নিষিদ্ধফল’ কাহিনি অবলম্বনে একটি হাসির ছবি তৈরি করেছিল অরোরা। ‘Muskil Asaan is a lukewarm Comedy’ শীর্ষক প্রতিবেদনে Amrita Bazar Patrika (14.3.1953) ছবিটিকে খুব একটা ভালো বলে উল্লেখ করে না, ‘Muskil Asaan of Aurora Films is a two hour long unraveling of comic and gay happening shaping at a breakneck speed and ending always in staid cinematic se- quence. The result is an easy-to-imagine pattern of story which does not demand any very clever direction or imagina- tively rich treatment.’

সুব্রত লাহিড়ী এবং মঞ্জুশ্রী চ্যাটার্জী, দুজন নবাগত, মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে এই ছবিতে। হয়তো অরোরা ভেবেছিল ছবিটি ভালোই ব্যাবসা করবে, তাই, একইসাথে ৮টি হলে মুক্তি পায় ছবিটি। কিন্তু ‘মুস্কিল আসান’ আদৌ ভালো চলেনি।

Hindustan Standard (20.3.1953)-র মতে, ‘Its only drawback is slow tempo and its overstress on hero’s occasionally foolish behavior.’ ছবিটির বাণিজ্যসফল না হওয়ার কারণ হিসাবে Amrita Bazar Patrika আরও বলে, ‘And the most disturbing element, it has to be observed, is the music of the film from beginning to end.”

‘জয়দেব’ (১৯৫৪)

পরপর তিনটি ভিন্ন ধারার কাহিনিচিত্র, শিশুদের ছবি, পৌরাণিক এবং সামাজিক ছবি, নির্মাণের পর অরোরা কবি জয়দেবের জীবন কাহিনি নিয়ে একটি ভক্তিমূলক ছবি তৈরি করতে আগ্রহী হয়। ছবিটিতে একুশখানি গান ছিল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই গানগুলির ভূয়সী প্রশংসা হয়। Amrita Bazar Patrika-য় লেখা হয়, ‘… while the film’s mounting and technical qualities are just adequate, it commands attention for the excellent musical score of Nachiketa Ghosh. In songs as well as background music a refreshing touch of classicism appreciably enhances the film’s entertainment value.’। ছবিটি একইসাথে গ্রাম এবং শহরের সবরকম দর্শকের কাছেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। প্রথম মুক্তির পর টানা ৫৬ দিন চলে উত্তর কলকাতার ‘শ্রী’ সিনেমা হলে। মধ্য কলকাতায় ‘বীণা’ সিনেমায় এবং দক্ষিণ কলকাতার ‘বসুশ্রী’-তে চলে ৪৯ দিন করে। অন্যদিকে বাঁকুড়ায় টানা ৩৫ দিন, ‘নৈহাটি সিনেমা’য় ২১ দিন, ‘নবদ্বীপ সিনেমা’য় ৩৩ দিন ইত্যাদি পরিসংখ্যান পাওয়া যায় ছবিটির জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে। দেখা যায়, ১৫/১২/১৯৭৫ তারিখ পর্যন্ত ছবিটি মোট আয় করেছে তিন লক্ষ ছিয়ানব্বই হাজার আটশো বিরাশি টাকা একাশি পয়সা (৩,৯৬,৮৮২.৮১ টাকা)।

‘রাইকমল’ (১৯৫৫)

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর রচনার চিত্ররূপ রাইকমল ছিল সিনেমার বিভিন্ন আসিক যেমন সংগীতধর্মী, সামাজিক ও কিছুটা ভক্তিমূলক আসিকের সমন্বয়ে তৈরী অরোরার একটি ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা। এক উদ্ভিন্ন যৌবনা কিশোরীর পার্থিব প্রেম এবং শাশ্বত ভাবনার নিরন্তর টানাপোড়েনে বিক্ষত হওয়া বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গ্রন্থিত কাহিনি, সমসাময়িক ছবিগুলির প্রেক্ষিতে অরোরার প্রযোজনায় স্বাতন্ত্র্য এনে দেয়। ‘Raikamal, a literary gem filmed with fine charm’ শীর্ষক চিত্র আলোচনায় Amrita Bazar Patrika (26.3.1955) লেখে, ‘Among current releases of Bengali films in Calcutta, the picture or it is a poem? which come first and foremost to my mind is ‘Raikamal’ a more than two hour pleasant dream in celluloid,’

ছবিটির মূখ্য চরিত্রে নায়িকার ভূমিকায় নবাগতা কাবেরী বসুর অভিনয় যথেষ্ট প্রশংসা পায়।

Hindustan Standard (18/3/1955) লেখে, ‘Raikamal is like a full blown lotus; it has a beauty that pleases the eye, fragrance that fills the heart, and, above all, everything in it seems real a rare attribute in a world of make believe. Amrita Bazar Patrika (18/3/1955) আরও লেখে, ‘It requires extraordinary courage on the part of a director to trust a new corner with such a complex role as that of its heroine who literally appears in every scene.’ ছবিটিতে সাতাশখানি ভক্তিমূলক গান ছিল কীর্তন আঙ্গিকে। জনসেবক পত্রিকা (১৮/৩/১৯৫৫) গানগুলির ভূয়সী প্রশংসা করলেও, আনন্দবাজার পত্রিকার (১৮/৩/১৯৫৫) মতে, একই কঠে গীত হওয়ার জন্য এক ধরনের একঘেয়েমি এসে যায় এবং গানগুলো ছবির বোঝা হিসেবে প্রতিপন্ন হয়।

মূলত গ্রামজীবনের গল্প হলেও ছবিটি শহরে মানুষের কাছেই বেশি জনপ্রিয় হয়। প্রথম মুক্তির পর টানা ছেষট্টি দিন উত্তর কলকাতার ‘দর্পনা’ ও দক্ষিণ কলকাতার ‘পূর্ণ’ সিনেমায় চলে। সেই তুলনায় গ্রামের বাজারে ছবিটি এক-দু সপ্তাহের বেশি চলেনি। ১৯৫৬ সালে ছবিটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য নির্বাচিত হয়। এই বছরেই ২৭ জুন ছবিটি বার্লিন টেলিভিশনে দেখানো হয়। এটিই প্রথম ভারতীয় ছবি যা বিদেশী টেলিভিশনে দেখানো হয়। ছবিটি ম্যানিলা চলচ্চিত্র উৎসবেও নির্বাচিত হয়।

‘পরিশোধ’ (১৯৫৫)

ছবিটির কাহিনিকার ও পরিচালক ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। যদিও ছবিটি সেভাবে ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। বসুমতী পত্রিকার (৬/৫/১৯৫৫) মতে, ‘ভাল ছবি হবার প্রচুর সম্ভাবনা ছিল। তা সত্ত্বেও যদি পরিশোধ ভাল ছবি না হতে পেরে থাকে, তাহলে তার জন্য চিত্রনাট্যকেই দায়ী করবে প্রধানত।’ আনন্দবাজার পত্রিকা (৬/৫/১৯৫৫) চিত্রসমালোচনা করে, ‘ভালো ছবি তৈরী করতে যা সমাবেশ দরকার ভালো কাহিনী, অভিজ্ঞ পরিচালক, কৃতি কলাকুশলী, শক্তিমান শিল্পী তার কিছুই বাদ পড়েনি ‘পরিশোধ’ নির্মাণে।… কিন্তু এক্ষেত্রে মুশকিল হয়েছে ঘটনার ওপরে জোর oniamino bne lub e prosegue to grimel onl দেখার চেয়ে কাহিনী সংলাপ প্রধান করতে গিয়ে। ঝিমিয়ে, ঠেকে, থেমে ব্যাখ্যান, যা আরম্ভের অব্যবহিত পর থেকে কৌতূহল ও আবেগকে এমন থিতিয়ে দেয় যে শেষ পর্যন্ত তা আর সজাগ হয় না।’

Hindustan Standard (6.5.1955) ছবিটির সমালোচনা করে সবথেকে বেশি, ‘The title is deceptive. For if it implies the repayment of a debt, there is no indication of its nature, or to whom it is owing and by whom. Some may even explain the title as the repayment by pircture goers of debt which perhaps they owe unknowingly to Aurora Film Corporation. Such in interpretation would not be wrong either, because paying for this picture at the box office would be no pleasure unless it is some repayment of some past debt,’

‘মহানিশা’ (১৯৫৬)

অনুরূপা দেবীর বহুপঠিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হলেও, ছবিটি কিন্তু আদৌ জনপ্রিয় হয়নি। যদিও Hindustan Standard (13.1.1956) চিত্রসমালোচনায় ছবিটির প্রশংসা করেছিল, ‘The story is super charged with sub-staff and its emotional appeal added with some nice characterization will please many who have liking for heavy, sentimental dreams.’ তথাপি দৈনিক বসুমতী-র (২০/১/১৯৫৬) মতে ছবিটির চিত্রনাট্য এবং নির্মাণ ভালো হয়নি। Amrita Bazar Patrika (20.1.1956) লেখে, ‘It is sad to observe that the actual film translation has failed to satisfy even the modicum o expectations. It is that kind of a film which leaves one cold and, what is worse, falls between two stools, modernistic and old-fashioned treatment. The blame for this may be squarely divide between the scenarist and the director, by which it can not certainly be meant that the producers escape their due share of criticism for the shabby and rickely physical framework they have given to the production… As one goes through the film, one has the feeling of experiencing a dull and cramping tale which scarcely seems real. Even where it appears reality, no interest or appeal is felt, so that the climax at the end of a discursive telling looks no more than uninspiring.

‘হরিশচন্দ্র’ (১৯৫৭)

দুটি সামাজিক কাহিনি নির্ভর ছবির বাণিজ্যিক ব্যর্থতার পর অরোরা, পুনরায় পৌরাণিক কাহিনিকেই ছবির বিষয় হিসাবে নির্বাচন করে। কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে, পৌরাণিক কাহিনিচিত্রে গড়পরতা নিয়ম মেনে আখ্যান বর্ণনায় কল্পনাবিলাস ব্যতিরেকে ছবিটি, রাজা হরিশচন্দ্রের মানবিক মূল্যবোধের জীবনদর্শন সোজাসাপটা নাটকে ব্যক্ত করে। Cine Advance (7.6.1957) ছবিটি প্রসঙ্গে লেখে, ‘Of the many mythological films shown in recent times, Harishchandra should prove more than agreeable because of its comprehensive get-up. It is perhaps impossible to imagine a mythological without its usual harvest of trick camera shots. But the producers here has taken care not to present the audience with too many trick shots which give the film an air of magic show. So we can enjoy the film as a moving human drama where a king desperately tries to stick to his words.’

ছবিটি অরোরাকে ব্যবসায়িক সাফল্য দেয়, উত্তর কলকাতার ‘শ্রী’ সিনেমা হলে টানা ছাপান্ন দিন চলেছিল। অন্যান্য হলেও ছবিটি ভালোই দর্শকানুকুল্য লাভ করে। Amrita Bazar Patrika (7.6.1957) চিত্র সমালোচনা করে, Phami Barma’s direction is however straight forward and business like, proceeding to the point and seldom making fuss. He has pointed the articles well through the dramatic happening… Most of the songs are beautifully tuned and excellently rendered and these should form a strong point of attraction for the film.

‘জলসাঘর’ (১৯৫৮)

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ছবিটি তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ইতিমধ্যেই অরোরা সত্যজিৎ-এর ‘পথের পাঁচালী’ এবং ‘অপারিজত’ পরিবেশন করেছিল। ওই দুটি ছবির মতো ‘জলসাঘর’ও প্রভূত প্রশংসা পায়।

Hindustan Standard (17.10.1958) লেখে, “In artistic achievement this latest film from Satyajit Ray is a definite landmark in Indian movie history and reveals a new facet of its director’s creative genius… Jalsaghar is mainly a director’s picture and it bristles with his creative touches.” Amrita Bazar Patrika (17.10.1958) চিত্রসমালোচনা করে, “To asses his directiorial capacity judged from Jalsaghar the critic is apt to be confused where and how to begin. There is such a maturity of realization of every detail of tragic human life writ large on every foot of his picture that it once again Satyajit Roy from the bulk of his class Splendid is the word that only partially describes Satyajit Roy in Tarashankar’s fine study of decayed aristocracy in Jalsaghar.”

ছবিটি কলকাতার শহুরে দর্শকদের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়। প্রথম মুক্তির পর ‘পূর্ণ’ এবং ‘রাধা’ সিনেমা হলে ছাপান্ন দিন করে এবং ‘প্রাচী’ সিনেমা হলে বিয়াল্লিশ দিন চলেছিল। অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহেও ছবিটি ভালোই চলে।

‘চুপিচুপি আসে’ (১৯৬০)

‘এটি রহস্য চিত্র। রহস্য অপরাধের। অপরাধী কে? এই প্রশ্নে চিত্রকাহিনির শুরু, রহস্য উন্মোচনে এর সমাপ্তি।’ আনন্দবাজার পত্রিকায় (১/৭/১৯৬০) এইভাবেই শুরু হয়েছিল চিত্র সমালোচনা। হলিউডের রহস্য ছবির আদলে প্রযোজনার চেষ্টা করলেও অরোরার এই ছবিটি বিশেষ সাফল্য পায়নি। আনন্দবাজার পত্রিকা বিশ্লেষণ করে, ‘চলচ্চিত্রে শিল্পরূপের গোড়ার কথা দৃশ্য এবং গতি। রহস্য কাহিনিকে ছায়াচিত্রে রূপান্তরিত করতে গেলে দৃশ্য তথা কাহিনি, পরিবেশ এবং ঘটনার গতিবেগ সৃষ্টি: এই দুটি বস্তুকে বিশেষভাবেই প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বস্তু দুটি সেই প্রাধান্য পায়নি।’ Amrita Bazar Patrika র মতে আলোচ্য ছবিটি অবোরার অন্যান্য ছবিগুলির তুলনায় অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বল, বিশেষত এর পরিচালনা এবং নির্মাণের প্রযুক্তিগত দিকগুলি। Hindustan Standard (1/7/1960) লেখে, ‘In minor details, however, he (director) reveals extreme carelessness. He has also packed the proceeding with too much dialogue which has considerably slowed down the film’s tempo a vital falling in a crime drama.”

‘ভগিনী নিবেদিতা’ (১৯৬২)

‘Not many Films like this have been made in India with the same Authenticity As Of A Greek Drama.’- Amrita Bazar Patrika (23.2.1962) এইভাবেই শুরু করেছিল ছবিটির আলোচনা। Sport & Pastime (17/3/1962) লেখে, ‘At a time when the unconventional cinema is smashing many traditions and the conventional cinema is making a desperate attempt to cling at box office with the help of a routine story, and stars in demand, Aurora Film Corporation’s Bhagini Nivedita has come out as one of those rare films that educate the mind of a nation and, at the same time, gives a new stature to film entertainment. It is a type of moving, emotional and highly dramatic motion picture which silences criticism and evokes spontaneous admiration and unprejudiced praise’

ছবিটি জীবনীধর্মী হলেও, তার আখ্যাবর্ননায় অভিনবত্ব নিয়ে আসে অরোরা। আনন্দবাজার পত্রিকার (২৩/২/১৯৬২) মতে, ‘বিষয়বস্তুর গৌরব একটি চলচ্চিত্রকে যে কি মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে পারে ‘ভগিনী নিবেদিতা’ তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণরূপে উপস্থিত।… নিবেদিতার আধ্যাত্মিক অনুভূতি, দার্শনিক চিন্তা ও ঈশ্বর সাধনার বিষয় এই চিত্রে প্রাধান্য পায়নি। একান্তভাবে এই সূক্ষ্ম অনুভূতি ঠিক চলচ্চিত্রে উপস্থাপনের উপযোগীও নয়। বরং নিবেদিতার কর্মধারার মধ্যে তার আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও প্রত্যয়ের যেটুকু প্রকাশ পেয়েছে তারই মাধ্যমে তাঁর ধর্ম ও কর্মের তত্ত্বটি উদ্‌ঘাটিত। সেই কর্মধারার রূপায়ণে ছবির গভীর মানবীয় আবেদন ঘনীভূত হতে পেরেছে।… প্রচলিত অর্থে নাটক বলতে যা বোঝায় সেই হিসেবে ছবিটি নাট্যধর্মী নয়। কিন্তু ঘটনা নির্বাচন এবং বিন্যাসের গুণে মুহূর্তে-মুহূর্তে যেন ছবিতে খণ্ড-খণ্ড নাটক গড়ে উঠেছে। বস্তুনিষ্ঠা, সংযত প্রকাশভঙ্গি এবং পরিমিত বোধের যে-পরিচয় পরিচালক এই চিত্রে রেখেছেন, বাংলা ছবিতে তা বিরল।’

পরিচালনার প্রসঙ্গে Amita Bazar Patrika (23/2/1962) লেখে, ‘Bijoy Bose, who makes his directorial debut in this remarkable film, deserves the highest commendation for his reverential and sincere handling of a unique theme. Hindustan Standard (23.2.1962) এর মত অনুযায়ী, ‘The best point about this fascinating film is that it does not indulge in exaggerations. Everything is presented on the screen in its correct setting, and proper care has been exercised in selecting the locales and its characters.’

এটিই প্রথম বাংলা ছবি যার কিছু দৃশ্য বিলেতে শুটিং হয়েছিল। সম্ভবত ছবিটি নির্মাণের সময়ই এর সম্ভাবনাময় বাজারের কথা বুঝেছিল অরোরা। ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রথম মুক্তির পর ‘রাধা’ এবং ‘পূর্ণ’ সিনেমায় টানা ১১৯ দিন চলেছিল ছবিটি। ১৯৬১ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পায় ছবিটি। ১৯৬২ সালে, ভেনিসে অনুষ্ঠিত ২৩ তম ‘International Exhibition of Cinemato graphic Art’-এ অংশগ্রহণ করে।

‘রাধাকৃষ্ণ’ (১৯৬৪)

রাধাকৃষ্ণের প্রণয় কাহিনি নিয়ে এরপর পৌরাণিক আখ্যাধর্মী ছবি তৈরি করতে উদ্যোগী হয় অরোরা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ‘কালীয় দমন’ দিয়ে এই গীতোপাখ্যানের শুরু তারপর বিভিন্ন লীলা বর্ণনার মধ্যে দিয়ে ক্রমশ ছবি এগিয়ে চলে। যদিও ছবিটি দর্শকানুকূল্য পায়নি। পরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়, নবাগত উত্তর ব্যানার্জী এবং সঞ্চিতা ব্যানার্জীকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে নেওয়ার পাশাপাশি চল্লিশটি সনাতন ঘরানার সংগীতের সমাবেশ ঘটান ছবিতে। কিন্তু ছবিতে শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বরিক ভাবমূর্তির বদলে প্রেমিক সত্ত্বা-ই বেশি প্রাধান্য পায়।

Hindustan Standard (24.7.1964) চিত্র সমালোচনা করে, ‘The Radha-Krishna love Saga has been brought down to the level of adolescent romping of roadside Romeos in this indifferent film from Arora, once the pioneer among producers. The main trouble with it is its faliure to create a proper setting for this romantic spree of Gods.’

‘রাজা রামমোহন’ (১৯৬৫)

‘ভগিনী নিবেদিতা’ কাহিনি নিয়ে অভাবনীয় সাফল্যের পর, রাজা রামমোহন রায়-এর জীবন নিয়ে আরেকটি ছবি প্রযোজনা করে অরোরা। ব্যবসাটির দিক থেকে বিচার করলে এটি অরোরার সবথেকে বাণিজ্য সফল ছবি। প্রথম মুক্তির পর ‘শ্রী’ এবং ‘ইন্দিরা’ পেক্ষাগৃহে সিনেমাটি টানা ১৩৩ দিন চলেছিল এবং পরবর্তী দশ বছরে (২৯/১২/১৯৭৫) ছবিটি তার ৩৫ মি.মি. প্রিন্ট থেকে ৭,৮০,৩৭৭ টাকা ৩২ পয়সা এবং ১৬ মি.মি. প্রিন্ট থেকে ৩,৩০৮ টাকা ২৫ পয়সা আয় করে।

সমস্ত সংবাদপত্রই চিত্রসমালোচনায় ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন, সমস্ত যুবসম্প্রদায়কে ছবিটি দেখার উপদেশ দেন। এটিই প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র যা প্রমোদকর থেকে অব্যাহতি পায়। রাজ্য ছায়াচিত্র পুরস্কার প্রদান কেন্দ্রীয় কমিটি ছবিটিকে হিন্দি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় দেখানোর জন্য সুপারিশ করে। ওই বছর, বাংলার তৃতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে রাজা রামমোহন ‘সার্টিফিকেট অফ মেরিট’ লাভ করে।

‘আরোগ্য নিকেতন’ (১৯৬৯)

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি ‘আরোগ্য নিকেতন’, অরোরার প্রযোজনায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির তালিকায় আর একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সনাতন বিশ্বাস এবং আধুনিকতার দ্বন্দ্বময় কাহিনিচিত্রটি, প্রায় সমস্ত চিত্র সমালোচনায় যথেষ্ট প্রশংসা পায়। বিশেষ করে ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে বিকাশ রায়-এর অভিনয়, যেমন Hindustan Standard (2.1.1970)-এ আলোচিত হয়, ‘Give Bikash Roy a role with some worth and look out for the fire works. The substance of this showbiz saying is well reflected in Aurora’s Arogya Niketan…’। তবে মূল গল্পের চলচ্চিত্রায়ন নিয়ে The Statesman (1.1.1970) আদৌ খুশি হয়নি,- ‘Arogya Niketan may not be a novel of exceptional merit, but it has a certain integrity which has been completely lost in the process of its cinematic transformation.’

যদিও ছবিটি ভালোই বাজার পেয়েছিল। প্রথম মুক্তির পর ‘মিনার’, ‘বিজলী’, ‘ছবিঘর’-এ টানা এগারো সপ্তাহ চলেছিল।

‘দুরন্ত জয়’ (১৯৭৩)

৭০-এর দশকে অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ছেলের প্রতিবাদী হয়ে ওঠার কাহিনি ‘দুরন্ত জয়’। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে দুজন নবাগত অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে পরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আরো একবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এবং বলা বাহুল্য, আরও একবার চূড়ান্ত অসফল, ‘দুরন্ত জয়’ অরোরার সর্বশেষ প্রযোজনা।

একটি সমান্তরাল অস্তিত্বের সন্ধানে

নিজেদের প্রযোজিত ছবির পাশাপাশি অরোরা, অন্যান্য প্রযোজকদের কিছু ছবি পরিবেশনও করেছিল। কিন্তু স্টুডিও যুগে যেমন সব ধরনের ছবি পরিবেশন করত অরোরা, এই পর্যায়, কেবলমাত্র বাংলা ছবি, তা-ও আবার মূল ধারার বাইরে সমান্তরাল ছবির প্রতি আগ্রহই ছিল বেশি। ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘পরশ পাথর’, ‘অযান্ত্রিক’ প্রভৃতি বা পরবর্তীকালে স্বপ্ন নিয়ে, ‘ময়নাতদন্ত’-র মতো ছবির পরিবেশনা কি আদৌ খুব লাভজনক ছিল? যদি ছবি পরিবেশনার ক্ষেত্রটি অরোরার মূল ব্যবসা- ই হয়, যেমন হয়েছিল স্টুডিও যুগে, তাহলে মূলধারার ছবির পরিবেশনা কেন এড়িয়ে গিয়েছিল অরোরা?

বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একটা অগ্রজ প্রতিষ্ঠান হিসাবে, মূলধারার ছবির সমান্তরাল একটা বাজার তৈরির চেষ্টা করেছিল ‘অরোরা। পাশাপাশি, বাংলা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চিরায়ত মূল্যবোধ, যা বারবার ফিরে এসেছে তাদের সৃষ্টিতে বা নির্মাণে, যার সূচণা হয়তো অনেক আগে, ৩০-এর দশকে মূল স্রোতের বাইরে এসে সংবাদচিত্র তৈরির প্রচেষ্টা বা আরো শুরুতে, বিংশ শতাব্দীর প্রাক্কর্বে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের উৎপত্তির সময় থেকেই বয়ে এনেছে অরোরা। তাই হয়তো অরোরা-র পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল ব্যবসায়িক গুরুত্ব উপেক্ষা করে ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচন, সমসাময়িক মূল্যবোধের প্রেক্ষিতে আধুনিকতার সহজ চলচিত্রায়নকে অনায়াসে এড়িয়ে যাওয়া।

Amrita Bazar Patrika (2.2.1970)-র একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, “That with all the temptation of making peepy, sex oriented films some producers should still be drawn producing idealistic and purposeful pictures is a standing compliment to those few in Bengali alone. Aurora Film Corporation has been steadily and noticeably following the tradition of producing pictures that just can not be lost in the melee of glamour coated but dirt cheap money spinners.’

Cine Advance (1.3.1962)-এ লেখা হয়, ‘The elephant is dead and M.P. studios have closed down their doors… The institution which is still there to make worth while motion pictures is the Aurora Film Corporation.’

তবুও মনে হয়, বাজারকে এভাবে উপেক্ষা করা হয়তো ঠিক হয়নি অরোরা- র। ফলে, প্রযোজনা ও পরিবেশনা, দুটি ক্ষেত্রই বন্ধ করতে হয় একসময়।

এখন অরোরা

অরোরা-র শেষ কাহিনিচিত্রের প্রযোজনা ‘দুরন্ত জয়’ (১৯৭৩), শেষ নতুন ছবির পরিবেশনা ‘ময়না তদন্ত’ (১৯৮২)। এর পরবর্তী পর্যায়ে অরোরাকে আর কাহিনিচিত্রের প্রযোজনা বা পরিবেশনা করতে দেখা যায় না। যে অরোরা গোটা বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস জুড়ে তার দীর্ঘ যাত্রাপথে, বিভিন্ন যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে নিত্যনতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রয়োগ করে জিতে গিয়েছিল বাজার দখলের প্রতিযোগীতায়, সেই অরোরা এই পর্যায়ে এসে সীমাবদ্ধ হয়ে রইল বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তথ্যচিত্র নির্মাণ, মূলত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বরাত আর কর্পোরেট ছবি তৈরির সীমিত আয়োজনে। ইতিমধ্যে পারিবারিক বিভাজনে অরোরার মূল ব্যাবসা হয়ে দাঁড়াল পুরোনো ছবিগুলির পরিবেশনা এবং স্টুডিও ফ্লোর, যন্ত্রপাতি, ল্যাবোরেটরি ভাড়া দেওয়া।

৭০-এর দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে কতকগুলি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। (১), ফিল্মস্টক, কেমিক্যালস্, ক্যামেরার ভাড়া, কলাকুশলী-টেকনিশিয়ানদের মজুরি প্রভৃতি হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যায়। ফলে ছবি প্রযোজনার খরচ বেড়ে যায়। (২) রাজনৈতিক অস্থরতা ছবি দেখার অভ্যেস বদলে দেয়। আগে বাংলা ছবির নাইট শো দেখার যে জনপ্রিয়তা ছিল, ৭০-এর দশকে তা বন্ধ হয়ে যায়। অথচ পরিবারের মহিলারা, যাদের সবথেকে প্রিয় সময় ছিল নাইট-শো, অর্থাৎ এইসময় থেকে বাংলা ছবি একটি বিশেষ দর্শকশ্রেণী হারায়। (৩) হিন্দি সিনেমা প্রযুক্তিগতভাবে ক্রমশ উন্নত হয়। সিনেমাস্কোপ, শব্দে ডলবি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, বিদেশে শুটিং এসবের পাশে বাংলা ছবি তার জৌলুস হারায়। (৪) ছবি পরিবেশনার পুরোনো নিয়মকানুন ভেঙে গিয়ে একদল বুকিং এজেন্ট বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। (৫) সর্বোপরি, ৭০-এর মাঝামাঝি টেলিভিশন আসে এবং পরবর্তী দশকে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।

নতুন যে একদল প্রযোজক আসে, তারা একটা নতুন মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দেয় যা অরোরার সনাতন সাংস্কৃতিক ধ্যানধারণার সাথে মেলে না। আর এই পরিবর্তিত অবস্থায় পুরোনো মূল্যবোধ কতটা বাণিজ্য করবে অরোরা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। অর্থাৎ, আবার সেই পরিবর্তিত বাজার সম্বন্ধে সংশয় এবং সরাসরি প্রতিযোগীতায় নামার দ্বিধা। ইতিমধ্যে দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কেন্দ্রীভূত হলে, উত্তর কলকাতার অরোরা স্টুডিও, অন্যের প্রযোজনায় ফ্লোর, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি ভাড়া দেবার ব্যাবসায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে।

১৯৯৪-এ অজিত বসুর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র অঞ্জন বসু অরোরা-র দায়িত্ব নেন। প্রথমে স্টুডিওর পুনরুজ্জীবনের জন্য তিনি নতুনভাবে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে সল্টলেকে তিন একর জমিতে নতুনভাবে আবার স্টুডিও নির্মাণ শুরু হয়। ২০০৩ সালের ৫ জুন উদ্বোধন হয় আধুনিকভাবে নির্মিত নতুন অরোরা স্টুডিও। পাশাপাশি নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চিত্রগ্রহণের জন্য উন্নত ডিজিটাল ক্যামেরা, ডিজিটাল ছবি সম্পাদনার পরিকাঠামো তৈরি করেন তারা। এভাবেই, ১০০ বছরের পথ অতিক্রম করে ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছে অরোরা।

গ্রন্থপঞ্জি

১। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস, কালীশ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, বিধান সংগ্রহশালা, ১৯৬২।

২। ভারতীয় চলচ্চিত্র। একটি অর্থনৈতিক প্রতিবেদন, সোমেশ্বর ভৌমিক, কলকাতা, প্যাপিরাস, ১৯৯৬।

৩। Bhowmik, Someswar. Indian Cinema Colonial Contours, Kolkata.

৪। সোনার দাগ, গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষ, কলকাতা, যোগমায়া প্রকাশনী, ১৯৮২।

৫।  Barnow, Erik & S. Krishnaswami, Indian Film, OUP, 1980

৬। Armes, Roy. Third World Film Making and the West, Berkely, University of California, Press, 1987.

৭। সোমেশ্বর ভৌমিক রচিত প্রবন্ধ ‘সিনেমার আশ্চর্য বাজার’ শতবর্ষের চলচ্চিত্র, সম্পাদনা: নির্মাল্য আচার্য এবং দিব্যেন্দু পালিত, প্রথম খণ্ড, কলকাতা, আনন্দ, ১৯৯৬।

৮। আর রেখো না আঁধাবে, সজল চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা, যোগমায়া প্রকাশনী, ১৯৯৮।

৯। Jha, Bagiswar, B. N. Sirkar, Kolkata. Seagull.

১০। Rajadhyaksha, Ashish & Paul Willemen; Encyclopaedia of Indian Cinema. London. BFI. 1995

১১। Thoraval, Yves, The Cinemas of Inida. India. Macmillan. 2000

১২। বিশ শতকের বাংলা ছবি, তপন রায়, কলকাতা, বাপী প্রকাশনী, ২০০১।

বৈশাখী পত্রিকা (১৭ তম সংখ্যা – শতবর্ষে অরোরা) ২০০৯।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top