দেবদাসকে আমি চিনি । আইনের ছাত্র । শরৎচন্দ্রের দেবদাস নিয়ে একটা বাংলা টিভি চ্যানেলের জন্য অনুষ্ঠান বানাতে গিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওর সাথে আমার আলাপ । ঘটনাক্রমে ওর বাড়িও হুগলীতে । ওর বাবা ভূমি রাজস্ব দপ্তরের উচ্চ-আধিকারিক । আরো মজার বিষয় হল ওর বান্ধবীর ডাকনাম পারু ।
উপন্যাসের দেবদাসের সাথে এরকম ছোটোখাটো কয়েকটা মিল পেয়ে আমি ভেবেছিলাম ওকে নিয়ে একটা ছোট ছবি করবো । সেইজন্য ওর সাথে যোগাযোগ রেখে চলি নিয়মিত । দেবদাসও সুযোগ পেলে সপ্তাহে একবার আমার দক্ষিণ-কলকাতার ফ্ল্যাটে চলে আসে আড্ডা মারতে । আমার সাথে মাঝে মধ্যে শুটিং-এ চলে যায় । আমরা স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা করি । তখন আমরা সচেতন ভাবে চেষ্টা করি উপন্যাসের বাইরে এসে কতটা আলাদা ছবি করা যায় ! ইনফ্যাক্ট আমরা চাইনা আদৌ কোনো স্ক্রিপ্ট থাক, বরং দেবদাস–পারুর প্রেম নিয়ে যদি কন্টেমপোরারি কিছু একটা করা যায়, তবে ছবিটা জমে যায় । কিন্তু ভাবনাই চলে, মনমতো একটা আইডিয়া কিছুতেই দানা বাঁধৈ না ।
একদিন একটা শপিং-মলে শুটিং করছি, টিভি চ্যানেলের একটা বস্তাপচা গেম-শো । সেখানে পাঁচটা প্রোডাক্ট দোকানে সাজানো, যে দূর থেকে দেখে যতগুলো আইটেমের সঠিক দাম বলতে পারবে, ততগুলো সে পেয়ে যাবে, – এটাই গেম । বিভিন্ন লোক ট্রাই করছে, কাছাকাছি বলতে পারছে, একটুর জন্য জিনিস পাচ্ছে না বলে আফসোস করছে, খেলা বেশ জমে উঠেছে । এমনসময় একটা মেয়ে আসে, পরপর পাঁচবার সঠিক দাম বালে এবং জিনিসগুলো নিয়ে নেয় । এতদিন ধরে গেমশো-টা আমি করছি, এত বোকাবোকা যে আমার নিজেরই বিরক্ত লাগে এটা বানাতে, কিন্তু এমন ঘটনা কোনোদিন হয়নি, যে একজন এসে সবকটা প্রোডাক্ট নিয়ে চলে গেল । টিভিতে দেখলে পুরো মনে হবে যেন গট্-আপ !
স্বাভাবিকভাবেই খুব কৌতুহল হলো আমার । মেয়েটি ওয়েস্টার্ন পোষাকে বেশ ঝকঝকে, ডেনিম ব্লু জিন্স আর সাদা টপ, আবার একঢাল লম্বা খোলা চুল পাছা পর্যন্ত নেমে এসেছে, বলতে দোষ নেই বেশ ঝটকা লাগানো সুন্দরী। সেলস্ গার্ল বা সিমিলার দোকানের সাথে যুক্ত না হলে এমন এক্স্যাক্ট দাম বলতে পারা বেশ কঠিন । কিন্তু অবাক হলাম যখন সে বললো যে সে ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, জাস্ট জিনিসগুলো সে ব্যবহার করে তাই সে দাম জানে । যদিও পাঁচটার মধ্যে দুটো তার ব্যবহার করা মতো, বাকিদুটো এক্সক্লুসিভলি পুরুষদের এবং একটা বয়স্ক লোকের ব্যবহারের জন্য ছিল, আমরা সেভাবেই কম্বিনেশন করে সাজাই ।
শুটিং প্যাক-আপের পর, বাকি টিম অফিস যাবে, আমি আর যাবো না বাড়ি ফিরবো, তার আগে একটা বার্গার আর কোক নিয়ে বসেছি, মেয়েটি আমার সামনে এসে হাজির । যেহেতু ভাব জমানোর লোভটা আমিও ছাড়তে পারলাম না তাই, একটা পিৎজা আর কোক অফার করলাম । ওর নাম মুন ।
মুনের বাড়ি শিলিগুড়ি । এখানে হোস্টেলে থাকে । আমায় জিগেস করলো যে সে টিভি অ্যাঙ্কর হতে পারে কিনা ? আমি আরো একধাপ এগিয়ে তাকে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে দিলাম । বলা লাহুল্য, আমরা মোবাইল নম্বর আদান প্রদান করলাম এবং একদিন আমার ফ্ল্যাটে আসতেও বললাম ।
পরদিনই ফোন করে মুন সন্ধ্যেবেলা আমার ফ্ল্যাটে চলে এলো । আমরা অনেক্ষণ আড্ডা মারলাম, ডিনার করলাম । যেটুকু বুঝলাম বিভিন্ন কনসিউমার আইটেম ব্যবহার করা মুনের নেশা, বা অসুখও বলা যায় । ও প্রচুর জিনিস কেনে, যেকোনো নতুন জিনিস বাজারে এলেই ও কেনে, তাই প্রায় সবধরনের প্রোডাক্টের দাম ওর মুখস্থ । আর এর জন্য ওর প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয় । বাড়ি থেকে একটা নির্দিষ্ট টাকাই আসে, বাকিটা ও জোগার করে নেয় বন্ধুদের কাছ থেকে । যদিও মুনের অনেক পুরুষ-বন্ধু আছে এমন নয় । এ ব্যাপারে ও খুব সিলেক্টিভ । মনে মনে বুঝলাম মুনকে আমার ফ্ল্যাটে থেকে যেতে বলাও যায় । যদিও সেদিন আর কিছু বললাম না । এতো তাড়াহুড়ো করার দরকার আমারও ছিলো না । প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, আমার চরিত্রের কুখ্যাতি ঈর্শনীয় । একাধিক বান্ধবী (যদিও আমি তাদের সুযোগসন্ধানী ভাবি) আমার ফ্ল্যাটে মাঝে মধ্যেই রাত্রিবাস করে থাকে ।
আমার এক সহকর্মীকে বলে প্রথমেই মুনের একটা অ্যাঙ্কআরিং-এর কাজ পাইয়ে দিলাম । সিনেমার লোকজন এমনিতে খুব একটা সুবিধার হয়না, কিন্তু আমার সহকর্মীটি খুবই সজ্জন, ওর কাছে পাঠালে মুনের কোনো অনিষ্ট হবেনা এবং আমার হাতছাড়াও হবেনা, আমি নিশ্চিত । মুনের এপিসোড টেলেকাস্ট হলো, মুন কিছু টাকাও পেল, তা থেকে আমাকে একটা পার্ফিউম গিফ্ট করলো । তারপর একদিন ডিনার শেষে মুনকে প্রস্তাব দিলাম থেকে যাওয়ার । মুন আপত্তি করলো না, অবাক হবার কপট ন্যাকামি করলো না, আমাকে খুব ঘৃন্যও ভাবলো না কারন যেকোনো ময়ের মতোই সে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, সে প্রথম থেকেই জানতো, আমি কোনদিকে এগোচ্ছি ।
বিপত্তি হলো পরদিন সকালে (আপনি আবার দুম করে রাস্তায় দেখা দুটো কুকুরের মিলন-পরবর্তী দৃশ্য ভেবে বসবেন না) । ভোরবেলা হটাৎ কলিং বেল । আধো ঘুমচোখে কোনক্রমে উঠে পাজামার দড়ি বাঁধতে বাঁধতে দড়জা খুলে দেখি মূর্তিমান দেবদাস । কোনো মানে হয় ! ওকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে মুনকে ডেকে তুলে পাশের ঘরে ড্রেস করতে পাঠিয়ে, খিঁচরে যাওয়া মেজাজে সিগারেটের ধোঁয়া দিতে দিতে যা বুঝলাম, পারুর বিয়ে । এতে আর অবাক হবার কি আছে ? গল্পে তো এমনটাই ছিল । কিন্তু আমরা যেহেতু গল্পটা বদলাতে চাইছি, তাই সে আমার কাছে এসেছে যদি বিয়েটা আটকানো যায় ।
আমি পারুকে মোবাইলে আধঘন্টাখানেক ফোন করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, যথারীতি আটকাতে পারলাম না । দেবদাস বেজার মুখে আমার ঘরে বসে রইলো । কিন্তু এটা যদি গল্পের প্রথম প্লটপয়েন্ট হয়, তবে সেই সুপ্রভাতে আমার ঘরে, একই সঙ্গে গল্পের দ্বিতীয় প্লটপয়েন্টও লেখা হয়ে গেল । পাশের ঘর থেকে মুনকে এলো, আর অমনি দেবদাস ঢিস্ করে মুনের প্রেমে পড়ে গেল । সেদিন মুন শাড়ি পরেছিলো, হটাৎ ঘুম থেকে উঠে অগোছালো চুলের একটা হাতখোঁপা, এবং সত্যি বলছি, ঠিক সেই মূহুর্তে মুনকে এত অপূর্ব সুন্দর দেখতে লাগছিলো, যেকোনো পুরুষ ওর প্রেমে পড়তো । দেবদাস তো প্রায় বলেই ফেললো, ‘চন্দ্রমূখী, মাই মেল্যানক্যালি হোর !’
কিন্তু মাত্র একরাত প্রেম করে মুনকে ছেড়ে দেব, এত মহান আমি নই । সেদিন সন্ধ্যায় দেবদাসের বিরহে আমি আর দেবদাস আকন্ঠ মদ্যপান করলাম, তারপর ওকে বহুভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, সে যেন কিছুতেই মুনের প্রেমে না পড়ে । মুন অত্যন্ত খারাপ মেয়ে এবং সে কখনো কারো সাথে প্রেম করবে না । যদিবা সাময়িকভাবে সে দেবদাসের সাথে মেশেও সেটা কোনো সম্পর্ক হবে না, অচিরেই আবার বিচ্ছেদ এবং দেবদাস অত্যন্ত দুঃখ পাবে ।
কিন্তু দেবদাসও নাছোড় । ওল্ডমঙ্কের সাথে ফ্রি পাওয়া আমার সাধের গ্লাসটা শুন্যে ছুঁড়ে দিয়ে সে বললো, ‘ফল্ , ফলিং , ফলেন্ ! মা ফলেসু কদাচন ।’
অতয়েব, হাতে রইল সিনেমা । যদিও দেবদাস কোনো সময়ই আমার কাছে প্রেমের গল্প ছিলো না । বরং প্রেম – অপ্রেমের মধ্যে দোদুল্যমান এক তরুনের ঘৃণার গল্প মনে হতো দেবদাস । গত একশো বছর ধরে প্রেমে ধাক্কা খাওয়া সকল পুরুষের আইকন হয়ে ওঠা ‘দেবদাস’ আমার মনে হয়েছে একটা নেগেটিভলি কনস্ট্রাক্টেড নায়ক । সে একটা এমন বানিয়ে তোলা ‘ভদ্রলোক’ যে বেশ্যালয়ে যায় কিন্তু চন্দ্রমূখীকে ছোঁয় না । কিন্তু কপিরাইট যেহেতু আর নেই, আমরা এমন একটা দেবদাস বানাতে চাইছিলাম যে আমাদের রোজদিন দেখা কারো প্রেম কিম্বা বিরহের গল্প । আপাততঃ দেবদাস আর চন্দ্রমূখী ।
মুন চলে গেলেও তার ছায়া রেখে গেল আমার সিনেমায় । ওদের প্রথম আলাপ যেটুকু শুটিং করতে পারলাম অনেকটা এরকম, –
(আমার অফিসের লবি, সেখানে সোফায় মুন বসে, দেবদাস সামনে দাঁড়িয়ে)
দেব: তুমি যে গল্পের দেবদাসকে চেনো সে একটা স্যাডোম্যাজোকিস্ট, একটা ইম্যাসকিউলেইটেড হিরো । আমি রক্তমাংসের সাধারণ মানুষের মতো একজন ।
মুন: আমি আমার মতো ।
দেব: তাহলে আমরা নিজেদের মতো একটা গল্প তৈরী করতে পারি ?
মুন (ঠোঁট উল্টে): কি জানি ? হয়তো পারি ।
দেব: আমরা একে অন্যকে ভালবাসতে পারি ?
মুন: আজকের পৃথিবীতে সত্যি সত্যি ভালবাসা হয়তো আর সম্ভব নয় !
(কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ)
দেব: ক্যান উই শেয়ার আওয়ার টুগেদারনেস ? যতক্ষণ না ক্লান্তি অসে !
মুন: হয়তো পারি ।
দেব: আজ সন্ধ্যেবেলা আমরা কফি খেতে যেতে পারি ?
মুন: আজ তো হবেনা । সন্ধ্যেবেলা আমি আটকা । কাল হতে পারে –
দেব: কোথায় যাবে বলো
মুন: যেকোনো কোথাও । বারিস্তা । পার্ক স্ট্রিট । সন্ধ্যে ছ’টা ।
দেব: ঠিক । আমি ওখানে কাল তোমার জন্য অপেক্ষা করবো ।
২০০২
